শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন

‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক এখন কেওক্রাডং – খুলছে পর্যটন ও বাণিজ্যের দুয়ার’

জাহাঙ্গীর আলম
  • বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৭৮

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সবুজ প্রকৃতির মাঝে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চলা পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত সড়ক এখন দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক হিসেবে স্থান করে নিচ্ছে। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে এই সীমান্ত সড়ক। পাশাপাশি সড়কটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।

বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত এই সড়কের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৯৬৫ মিটার, যা বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ সড়ক হিসেবে পরিচিত। এর আগে এই তালিকায় শীর্ষে ছিল থানচি-বাকলাই লিক্রে সড়কের সাদ্রাহাফং পাহাড়ের রেমংপাড়া অংশ, যার উচ্চতা ছিল ৯২২ মিটার। সেনাবাহিনীর ২৬ কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নোমান মো. মইনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

দুর্গম পাহাড়ে এক সাহসী নির্মাণযজ্ঞ

২০১৮ সালে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় সীমান্ত সড়কের কাজ। প্রথম পর্যায়ে বান্দরবানের রুমা উপজেলার বগালেক থেকে কেওক্রাডং হয়ে ধুপানিছড়া পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করেছে সেনাবাহিনীর ২৬ কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন। এটি বৃহৎ ৩১৭ কিমি সীমান্ত সড়কের অংশ।

সড়কটি যুক্ত করবে তিন পার্বত্য জেলা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল

এই প্রকল্পটি বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। নির্মাণ সম্পন্ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ পার্বত্য সড়ক নেটওয়ার্ক (১০৩৬ কিলোমিটার)। যা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে সড়কপথে যুক্ত করবে।

সড়কটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শুরু হয়ে রাঙামাটির রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, জুরাইছড়ি, তারপর খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা হয়ে রামগড় সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পর্যটন, কৃষি, জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের বার্তা

সড়ক ঘিরে ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র, ফলের বাগান, হোমস্টে, স্থানীয় দোকানপাট।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, “এই সড়কের আশেপাশে গড়ে উঠেছে কাজুবাদাম, কফি, আম-লিচু বাগান, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।”

জেলা হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, “রুমা, বগালেক, মুনলাই পাড়া, পাসিং পাড়া, কেওক্রাডং, রাইংক্ষ্যং পুকুর, সুংসং পাড়া— সবকিছুই এখন পর্যটকদের কাছে সহজলভ্য।”

নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধেও বড় ভূমিকা

এই সড়ক নির্মাণের ফলে পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। স্থানীয় জনগণও চাঁদাবাজি, অপহরণ, সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাবে। সেনা কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম বলেন,

“এ সড়কটি সন্ত্রাসীদের জন্য আতঙ্ক। সীমান্ত এলাকায় পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর চলাচল সহজ হবে। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন সম্ভব হবে।”

ভবিষ্যতের বাণিজ্যকেন্দ্র হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম

সড়কটি রামগড়-সাবরুম, থেগামুখ স্থলবন্দর ও মিয়ানমারের চিন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সীমান্ত হাট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বিশাল সুযোগ তৈরি করবে। সেনা কর্মকর্তারা বলছেন,

 “এই সড়ক পার্বত্য চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে।”

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের আরো খবর