
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), লালদিয়া ও বে টার্মিনালে অন্তত প্রথম আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের লক্ষ্যে বিডা কাজ করছে।
১০ আগষ্ট (রবিবার) বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বর ফটকে এজেন্ট ডেস্ক’ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন— “আমাদের ইচ্ছে হচ্ছে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বড় পোর্টগুলোর কিছু প্রকল্পে মাইলফলক অগ্রগতি দেখিয়ে যেতে। কিছু চুক্তি স্বাক্ষর, কিছু গ্রাউন্ড ব্রেকিং শুরু হয়ে যাবে। যাতে নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসলেও কাজ থেমে না থাকে।”
চৌধুরী আশিক মাহমুদ জানান, আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি, বেস্ট প্র্যাকটিস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বন্দরের কার্যক্রমে যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর আনার বিষয়টি নতুন হলেও এটি বৈশ্বিকভাবে বহুল প্রচলিত এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

বর্তমান অপারেটর সিডিডিএল-এর পারফরম্যান্সকে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
তার ভাষায়— “এনসিটিতে সিডিডিএল দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক মাসে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ভলিউম ৩০% বেড়েছে। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমও ১৩% কমেছে। এটা বড় অর্জন।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১১ সালেও একবার অপারেটর পরিবর্তন হয়েছিল, তখন অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তবে এবার সমন্বিত উদ্যোগে বন্দর, সিডিডিএল ও নৌবাহিনী একসাথে কাজ করে ইতিবাচক ফল আনতে সক্ষম হয়েছে।
আলোচনায় আসে সৌদি আরবভিত্তিক অপারেটর আরএসজিটি (RSJTI)-র অভিজ্ঞতা।

বিডা নির্বাহী পরিচালক খোলাখুলি বলেন— “বাংলাদেশে তাদের অভিজ্ঞতা একদমই সুখকর ছিল না। বহু টেকনিক্যাল জটিলতায় পড়তে হয়েছে। ফাইন্যান্সিং স্ট্রাকচারের মতো বিষয়গুলো তাদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে। তবে ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী তারা বাংলাদেশের অর্থ আত্মসাৎ করে চলে যেতে পারবে না।”
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা বিষয়ে তিনি বলেন— “আমরা কখনো সঠিকভাবে নির্ধারণ করিনি বন্দর থেকে সর্বোচ্চ কত ভলিউম পাওয়া সম্ভব। রিপোর্ট বলছে ১.৯ মিলিয়ন টিইইউস হ্যান্ডলিং সম্ভব, যেখানে গত বছর ছিল ১.৩ মিলিয়ন। সিডিডিএল সেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি দেশি অপারেটর দিয়ে সর্বোচ্চ সক্ষমতা পাওয়া যায়, সেটি চমৎকার হবে। তবে প্রযুক্তিগত সুবিধা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আনলে আরও উন্নতি সম্ভব হলে সেই পথও নেওয়া হবে।
বন্দরের কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধিকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেখছেন।
তিনি উল্লেখ করেন—নতুন সফটওয়্যার চালুর ফলে ডকুমেন্ট জমা ও পেমেন্ট অনলাইনে করা যাচ্ছে। এতে সময় বাঁচছে, দুর্নীতি ও হয়রানি কমছে। করাপশন ইনডেক্সে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে সম্প্রতি ৫জি এমওইউ স্বাক্ষর এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার সমালোচনা করে তিনি বলেন— “বাংলাদেশে পাঁচ বছরের পরিকল্পনার প্রকল্প শেষ হতে ১৫ বছর লেগে যায়। তখন গ্লোবাল প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ি। এবার আমরা চাই এই ধারা ভাঙতে।”
তিনি স্পষ্ট করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে বড় প্রকল্পগুলো এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চান যেখানে ‘চাকা ঘুরতে শুরু করবে’ এবং পরে তা আর থামানো যাবে না।
শেষে তিনি বলেন— “আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ। দেশের জন্য যেটা ভালো হবে, সেটাই করব। চট্টগ্রাম বন্দরকে ১৫০% ক্ষমতায় চালাতে হবে, কারণ বেপজা, বেজা, হাইটেক পার্ক, শিল্পায়ন—সব ক্ষেত্রেই এই বন্দরই মূল চালিকাশক্তি।”
ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।