শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৬ পূর্বাহ্ন

সচিব পদায়নে স্থবিরতা: অন্তর্বর্তী সরকারেও প্রভাবশালী আমলাদের দৌরাত্ম্য

বার্তা টুডে ডেস্ক
  • রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ২১৪

জনপ্রশাসনে সচিব পদে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি ও সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের পারস্পরিক রেষারেষি ও সমন্বয়হীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে মাসের পর মাস সচিব পদ শূন্য পড়ে আছে। এর ফলে মন্ত্রণালয়গুলোর দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একদিকে মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তারা সচিব পদে পদায়নের জন্য অপেক্ষা করলেও তাদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাবশালী মহলের সদিচ্ছা থাকলে সচিব পদে পদায়ন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের ‘অপছন্দের’ কর্মকর্তা হলে তার নিয়োগ আটকে যাচ্ছে। এতে করে প্রশাসনে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

যোগ্য হয়েও বঞ্চিত

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে নবম ব্যাচের একজন কর্মকর্তাকে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতির সারসংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় অনুমোদন করলেও রহস্যজনক কারণে সেই পদায়ন হয়নি। অবশেষে বাধ্য হয়ে অবসরে যেতে হয় তাকে। যদিও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে পুনর্বহাল করা হয়, তবু সিনিয়র সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি কার্যকর হয়নি।

তিনি বলেন, “ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে আমি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবদের কাছে ধর্ণা দিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।”

শুধু তিনি নন, আরও অনেক যোগ্য কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন—বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সচিব পদায়ন করা হতো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনেকটা সেই ধারাই চলছে।

প্রভাবশালী মহলের চাপে স্থবিরতা

সচিব পদে নিয়োগ দিতে সারসংক্ষেপ অনুমোদন দেওয়া হলেও উপদেষ্টাদের পছন্দ না হলে তা কার্যকর হচ্ছে না। আবার প্রভাবশালী আমলাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও নিয়োগ আটকে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মন্ত্রণালয়ে সচিব নিয়োগ হলেও কেউ কেউ যোগদান করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার আপত্তির কারণে।

ফলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে মাসের পর মাস সচিব শূন্য থাকছে। প্রশাসনের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।

বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো। দক্ষতা, যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানো দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা হয়েছে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এখনো বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে প্রশাসন আরও অকার্যকর হয়ে পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “জনআকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র গঠনে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভিত্তিতে সুসংগঠিত করা জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতা ও কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট।”

পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে সচিব, সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার মোট পদ রয়েছে ৮৪টি। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবসহ ১৭ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে সচিব ও সিনিয়র সচিব পর্যায়ে ওএসডি রয়েছেন ১২ জন। সব মিলিয়ে প্রশাসনে ওএসডি কর্মকর্তার সংখ্যা ৫ শতাধিক ছাড়িয়েছে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যকর না হলে গোটা প্রশাসন অচল হয়ে পড়বে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নিলে দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় মারাত্মক সংকট তৈরি হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের আরো খবর