রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) চট্টগ্রাম রিজিওনে এখনও কর্তৃত্ব চালাচ্ছেন আওয়ামী আমলের আশীর্বাদপুষ্ট ও আইনের দৃষ্টিতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। অধিকাংশ পেশাজীবী সংগঠনে ক্ষমতার পালাবদল হলেও আবাসন খাতের এই প্রভাবশালী সংগঠনটিতে পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাব আর দুর্নীতিচক্রের আধিপত্য অটুট রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন: সাজাপ্রাপ্ত হয়েও সক্রিয়
রিহ্যাব চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটির বর্তমান চেয়ারম্যান হাজি দেলোয়ার হোসেন। তিনি সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং দলীয় শাসনামলে ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে তিনি একাধিক মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও রিহ্যাবের ব্যানারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের বৈঠকে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। পুলিশ কমিশনার, সিডিএ চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশন মেয়রসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ঘুরে ঘুরে বৈঠক করছেন— এমন ছবিও বহুবার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
একাধিক মামলা, তবুও অটুট পদ
১৭ জুলাই ২০২৫: ঢাকার সিএমএম আদালতে (মামলা নং সিআর-১৪১/২৫) দায়ের করা এক মামলায় দেলোয়ার হোসেনকে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট, ওবায়দুল কাদেরের ক্যাশিয়ার এবং আজিমপুর হত্যাকাণ্ডের অর্থ যোগানের অভিযোগ আনা হয়।
২৩ জুলাই ২০২৫: বাড্ডা থানার মামলা (নং ৩৭৬/২৫)-তে শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা অভিযোগে দেলোয়ারকে ১৬ নম্বর আসামি করা হয়।
সম্প্রতি একটি দুর্নীতির মামলায় আদালত তাকে ৮ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২১ লাখ টাকা জরিমানা দিয়েছেন।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন,
“সরকারি বা আধাসরকারি কোনো সংগঠনে সাজাপ্রাপ্ত আসামি কোনো পদে থাকতে পারে না। এটি নৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। তিনি এখন ‘ফেরারি’, তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা উচিত।”
ক্ষমতার ছায়ায় রিহ্যাবের রাজনীতি ও একচেটিয়া দখলদারি
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রিহ্যাব চট্টগ্রামে প্রায় ১২ বছর কোনো নির্বাচন হয়নি। আওয়ামী লীগপন্থি নেতৃবৃন্দ সংগঠন দখল করে রাখেন। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও মূল কমিটি গঠিত হয় একই গোষ্ঠীর লোক দিয়ে।
গত বছরের জনপ্রিয় গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পরও রিহ্যাব চট্টগ্রাম তাদের হাতে রয়ে গেছে; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা নিজেদের রঙ বদলে টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে।
সদস্যদের অভিযোগ এবং সংগঠনের স্থবিরতা
রিহ্যাবের বেশ কিছু সদস্য জানান—
আবাসন খাত দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং প্রায় ২৩৮টি লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি এ খাতের ওপর নির্ভরশীল;
অথচ দোষী ও অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা হয়নি;
আশু সংস্কার না এলে আবাসন খাত আরও বড় সংকটে পড়বে।
প্রশাসনের নিরবতা ও রিহ্যাব অফিসের অবস্থান
রিজিওনাল অফিসের সচিব বানার্ড বাবুল বলেন,
“চেয়ারম্যান বা পরিচালকের ব্যক্তিগত মামলা থাকলে সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। অফিস পরিচালনাই আমার দায়িত্ব। অভিযোগ থাকলে সেন্ট্রাল কমিটির সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
অপরদিকে রিহ্যাব পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মনজুরুল ফরহাদ জানান, “সাজাপ্রাপ্ত কেউ চেয়ারম্যান থাকতে পারেন না। যদি প্রমাণসহ অভিযোগ থাকে, তবে বিষয়টি রিহ্যাবের ভেতরে তোলা হবে।”
দেলোয়ার হোসেনের অতীত বিতর্ক
২০১৯ সালে দুদক তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে;
২৫ কোটি টাকা প্রতারণা ও ফ্ল্যাট জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে তার প্রতিষ্ঠান আরএফ বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে;
২০২১ সালে কক্সবাজারে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হন;
বহু বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
রিহ্যাব চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের প্রতিনিধিত্ব করলেও বর্তমানে এটি রূপ নিয়েছে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল’-এ।
একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যখন ব্যবসায়ীদের মাথায় বসে বৈঠকি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, প্রশাসন নীরব, কেন্দ্রীয় কমিটি নিশ্চুপ এবং সদস্যরা অসহায়— তখন প্রশ্ন ওঠে:
এটাই কি নতুন বাংলাদেশের চেহারা?