ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রাম–৪ আসনে (সীতাকুণ্ড উপজেলা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড) বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এ নিয়ে দলটির ভেতরে ও বাইরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল রাজধানীতে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভাকে কেন্দ্র করেই এ গুঞ্জন নতুন করে চাউর হয়।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, কুমিল্লা ও সিলেট বিভাগের সংসদীয় আসনে প্রাথমিকভাবে মনোনীত প্রার্থীদের নিয়ে ঢাকায় এ সভার আয়োজন করা হয়। নির্বাচনকেন্দ্রিক এ সভায় চট্টগ্রাম–৪ আসন থেকে আমন্ত্রণ পান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরী। তবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এর আগে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিনকে।
এ সভায় লায়ন আসলাম চৌধুরীর উপস্থিতির খবরে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—চট্টগ্রাম–৪ আসনে তিনিই হতে যাচ্ছেন বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী। এতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তার কর্মী-সমর্থকরা। অন্যদিকে কাজী সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠদের দাবি, দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তাই তারা মনে করছেন, কাজী সালাউদ্দিনের প্রতি দলের সমর্থন এখনো বহাল রয়েছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক চিঠি বা ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, গতকালের সভাটি ছিল মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি কর্মশালার মতো। এতে নির্বাচনী আইন-কানুন, প্রচার কৌশলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন অভিজ্ঞ নেতারা। সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থীদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম আজাদীকে বলেন, “চট্টগ্রাম–৪ আসন থেকে লায়ন আসলাম চৌধুরীকে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।”
সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল জানান, সভাটি ছিল অনেকটা কর্মশালার মতো, যেখানে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও আইনি বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
সভায় ডাক না পাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি কাজী সালাউদ্দিন। অন্যদিকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও লায়ন আসলাম চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ৩ নভেম্বর বিএনপি চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১০টি আসনে প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। ওইদিন চট্টগ্রাম–৪ আসনে কাজী সালাউদ্দিনের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি লায়ন আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় সেদিন তার অনুসারীরা চট্টগ্রাম–ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে কর্মসূচি পালন করা হয়। বিপরীতে কাজী সালাউদ্দিন নিয়মিত নির্বাচনী এলাকায় কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
লায়ন আসলাম চৌধুরী ২০১৬ সালের ১৫ মে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ ৮ বছর ৩ মাস কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। ওই অভিযোগকে তার পক্ষ থেকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন আসলাম চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুন তাকে যুগ্ম মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়। তিনি ২০০৮ ও ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম–৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শুরুতে দল এ আসনে আসলাম চৌধুরীকে নিয়ে পরিকল্পনা করেছিল। তবে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির মামলা থাকায় আইনি জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়। সে কারণেই বিকল্প হিসেবে কাজী সালাউদ্দিনকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেও আসলাম চৌধুরী দলীয় সভা-সমাবেশ ও কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় না থাকায় দলের হাইকমান্ড কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিল বলেও তারা জানান।
তবে আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠদের দাবি, মামলার আইনি জটিলতা কাটবে বলে তিনি দলকে আশ্বস্ত করেছেন। সে কারণে তাকে প্রার্থী করার বিষয়টি আবারও সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আছে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ড উপজেলা ও নগরের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম–৪ আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশ এ আসনের অন্তর্ভুক্ত, যা নির্বাচনকৌশলের দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।