পর্যটনের ভরা মৌসুমে কক্সবাজার ও মহেশখালীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও কক্সবাজার–মহেশখালী নৌপথে স্পিডবোট চালকদের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রীরা।
দ্রুত যাতায়াতের কারণে এই নৌপথে স্পিডবোটের চাহিদা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে—নিয়মবহির্ভূত পরিচালনা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিবাদ করলেই চালকদের রূঢ় আচরণের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সরেজমিনে কক্সবাজার–মহেশখালী নৌঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঘাটের দুই পাশে বিপুল সংখ্যক যাত্রী ও পর্যটক শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। নির্ধারিত সময়সূচি না থাকায় অনেকেই স্পিডবোট না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নিয়ম অনুযায়ী কক্সবাজার ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটগুলো মহেশখালীর গোরকঘাটা ঘাটে নোঙর করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক চালক পর্যটকদের ভুল বুঝিয়ে কম ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে আদিনাথ জেটিতে নামিয়ে দিচ্ছেন। এতে গোরকঘাটা ঘাটে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী পর্যটকরা অভিযোগ করে বলেন, স্পিডবোট চালকদের আচরণ অত্যন্ত অশোভন। তারা যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পারাপার করান।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রাশেদ মাহমুদ বলেন,
“পরিবার নিয়ে সকাল থেকে ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি। ড্রাইভাররা ঠিকমতো কথা বলে না, বরং চিৎকার করে। নিয়ম মানার কোনো বালাই নেই।”
চট্টগ্রামের বাসিন্দা পর্যটক নাজমুল হক বলেন,
“বোটে নির্ধারিত সংখ্যার দ্বিগুণ যাত্রী তুলছে। ভয় পেলেও কিছু বলতে পারছি না। প্রতিবাদ করলে চালকরা রেগে যায়।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মজীবী যাত্রী আবদুল করিম বলেন,
“প্রতিদিন এই দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়। সকালে বোট না পেলে কাজে যেতে পারি না। ড্রাইভারদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।”
ঘাটে দায়িত্বরত লাইনম্যান মোজাহিদ জানান, “স্পিডবোট চালকদের একটি সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিদিন গোরকঘাটা ঘাটে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। কক্সবাজার থেকে যাত্রী নিয়ে গোরকঘাটায় না এসে আদিনাথ জেটিতে নামিয়ে দিচ্ছে। একাধিকবার সতর্ক করা হলেও তারা মানছে না।”
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “স্পিডবোট সংক্রান্ত বিষয়টি আমার জানা আছে। তবে এটি ইজারা দেওয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিষয়টি পৌর কর্তৃপক্ষ বা উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।”
ইজারা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি মজিদ বলেন, “স্পিডবোট চালকদের অনিয়ম ও যাত্রী হয়রানির বিষয়টি আমরা অবগত। এ বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কক্সবাজার কার্যালয়কে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “বিআইডব্লিউটিএর তদারকি ও আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।”
যাত্রী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ইজারার আড়ালে স্পিডবোট চালকরা পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত। নির্দিষ্ট সময়সূচি, যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত ঘাটে নোঙর ও নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ ও কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন।