
জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক ব্যস্ততা, প্রশাসনিক চাপ কিংবা সরকারি দায়িত্ব—কোনোটিই থামাতে পারেনি মানবিক দায়বদ্ধতাকে। সরকারি প্রটোকলের বাইরে গিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে আবারও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সড়কের পাশে কনকনে শীতের মধ্যে উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করতে গিয়েই প্রথমবারের মতো নগরের খুলশী এলাকায় অবস্থিত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘উপলব্ধি ফাউন্ডেশন’ সম্পর্কে অবগত হন জেলা প্রশাসক। পুনর্বাসনের উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থান খুঁজতে গিয়ে তাঁর নজরে আসে এই প্রতিষ্ঠানটির মানবিক কার্যক্রম।
বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে জানার আগ্রহ থেকে জেলা প্রশাসক শনিবার (৩ জানুয়ারি) উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইজাবুর রহমান এবং ব্যবস্থাপক শেলী রক্ষিতকে নিজ কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে চরম ব্যস্ততার মধ্যেও প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে তিনি তাঁদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, শিশুদের জীবনযাপন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শোনেন। আলোচনা শেষে সেদিনই তিনি সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন।
এই সিদ্ধান্ত যে কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, তা প্রমাণ করে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে—সোমবার (৫ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসক নিজেই উপলব্ধি ফাউন্ডেশন পরিদর্শনে যান।
পরিদর্শনকালে তিনি ফাউন্ডেশনে আশ্রয়প্রাপ্ত হারিয়ে যাওয়া, স্বজনহীন ও ঠিকানাবিহীন অসহায় ভাসমান মেয়েশিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের খোঁজখবর নেন এবং শিক্ষা, আবাসন ও সার্বিক কল্যাণ বিষয়ে বিস্তারিত অবগত হন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৭৫ জন মেয়েশিশু বসবাস করছে, যাদের অনেকেই নিজেদের সঠিক ঠিকানা কিংবা আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। এসব শিশুর জন্য উপলব্ধি ফাউন্ডেশনই হয়ে উঠেছে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় ও ঠিকানা।
শুধু আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ না থেকে জেলা প্রশাসক শিশুদের জন্য এক বেলা খাবারের ব্যয় নির্বাহ ও বই কেনার উদ্দেশ্যে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন। শীতের তীব্রতা বিবেচনায় আশ্রয়প্রাপ্ত শিশুদের মাঝে ৮৫টি কম্বল বিতরণ করেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক হিসেবে অভিভাবকের ভূমিকায় শিশুদের জন্য দুই ঝুড়ি তাজা ফল উপহার দেন।
শিশুদের শিক্ষা ও সৃজনশীল বিকাশে সহায়তার লক্ষ্যে তিনি খাতা, কলম, রঙ পেন্সিল, ক্যালকুলেটরসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন। একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ব্যাডমিন্টন ব্যাট, নেট, কর্ক, বাস্কেটবল, দাবা বোর্ড ও লুডু বোর্ড প্রদান করেন।
পরিদর্শনের সময় শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক। একপর্যায়ে তিনি নিজের আসন ছেড়ে মঞ্চে উঠে শিশুদের সঙ্গে ছবি তোলেন।
উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইজাবুর রহমান বলেন,
“আমাদের এখানে আগেও অনেক জেলা প্রশাসক এসেছেন, তবে সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণে। কিন্তু বর্তমান জেলা প্রশাসক সাহেব আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকেই খোঁজ নিয়ে নিজ উদ্যোগে আমাদের ডেকেছেন—এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বিস্ময়কর ও গর্বের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন,“উনার ব্যস্ততার মাঝে আমাদের ডাকার কথা ছিল না। তবুও আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে সব শুনেছেন। আজ তিনি আমাদের রান্নাঘর পর্যন্ত ঘুরে দেখেছেন—বাচ্চাদের জন্য কী রান্না হচ্ছে, সেটাও নিজ চোখে দেখেছেন। নিশ্চয়ই তিনি সত্যিকার অর্থেই মানবিক বলেই এমনটা করেছেন।”
ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক শেলী রক্ষিত বলেন,“পথশিশুদের নিয়ে যার এত গভীর ভাবনা, তাকে আমরা নিঃসন্দেহে মানবিক ডিসি হিসেবেই দেখি। তিনি এখানে এসে প্রতিটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেছেন—তারা কোথা থেকে এসেছে, কেমন আছে, কী স্বপ্ন দেখে—সব জানতে চেয়েছেন।”
উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,
“একটি প্রতিষ্ঠান এতটা হৃদয়গ্রাহী, সুন্দর ও প্রাণবন্ত হতে পারে—তা আমার জানা ছিল না।”
তিনি বলেন,“মানুষ তো নিজের সন্তানের কথাই ভাবে। কিন্তু অন্যের সন্তানের কথা কয়জন ভাবে? অথচ আমরা নিজেদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব বলে দাবি করি।”
জাতীয় নির্বাচনের ব্যস্ততার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন,
“আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, আমাদের সময় আসলে সরকারের কেনা। সেই কেনা সময় থেকেই মানুষের জন্য সময় বের করতে হয়। আজ এখানে যে সময় ব্যয় করেছি, সেটাই আমার শ্রেষ্ঠ সময়।”
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন,“স্বপ্ন দেখতে হবে। পৃথিবীতে যারা বড় হয়েছে, তারা সবাই কষ্ট করেই বড় হয়েছে। এই উচ্ছ্বাস, এই আনন্দই জীবন।”
জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি উপলব্ধি ফাউন্ডেশনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন,“সুবিধাবঞ্চিত ও স্বজনহারা শিশুদের সঠিক সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তারা সমাজের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতে দেশের সম্পদে পরিণত হবে।”
উল্লেখ্য, উপলব্ধি ফাউন্ডেশনে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশুরা বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছে। পাশাপাশি তারা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।