ইতিহাসচর্চা, গবেষণা ও সাহিত্য সাধনার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হলো ‘ইতিহাসের পাঠশালা (দি একাডেমি অব হিস্ট্রি)’র ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন। এ উপলক্ষে ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩, রবিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি আল মাহমুদ লেখক কর্ণারে বর্ণাঢ্য জাতীয় সেমিনার ও লেখক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রাজ্ঞ ইতিহাসবিদ, গবেষক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সেমিনারের মূল আকর্ষণ ছিল “প্রাচীন বাংলা সাহিত্য বিবর্তন ও মনীষা মঞ্জুষা” শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ, যা উপস্থাপন করেন নোয়াখালীর কৃতীসন্তান প্রবীণ ইতিহাসবিদ ম. পানা উল্যাহ্। তাঁর গবেষণায় প্রাচীন বাংলার সাহিত্য ঐতিহ্য, ভাষার বিকাশ এবং মনীষীদের অবদান গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
ইতিহাসের পাঠশালার পরিচালক লেখক লায়ন দুলাল কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও সম্পাদক ইতিহাসবেত্তা সোহেল মো. ফখরুদ-দীন। তিনি ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে গবেষক ও লেখকদের দায়িত্ব অপরিসীম।”
তিন পর্বে বিভক্ত এ আয়োজনের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বপরিব্রাজক রোটারিয়ান অ্যাডভোকেট আলেয়া বেগম লাকী। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন হাতিয়া সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রবীণ ইতিহাসবিদ এনামুল হক এবং উদ্বোধক ছিলেন লেখক ও শিক্ষাবিদ হাবিবুর রহমান।
দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ ইতিহাসবিদ ও অনুবাদক সৈয়দা রুখসানা জামান শানু। প্রধান আলোচক ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসবিদ ড. দেবকন্যা সেন এবং উদ্বোধক ছিলেন প্রবীণ ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন উপ-সচিব, কৃষি প্রযুক্তিবিদ ও ইতিহাসবিদ সিরাজুল করিম। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডা. মোহাম্মদ মোছলেম এবং উদ্বোধক ছিলেন কোরআন গবেষক মোহাম্মদ হোসেন।
লেখক মিলনমেলার মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইতিহাসবিদ, গবেষক, কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মঈন উদ্দিন পাঠান, মো. কামাল উদ্দিন, আজম পাটোয়ারী, ম আ আবির আকাশ, ফজলুল মল্লিক, রুখসানা আকতার, আ ব ম মহিউদ্দিন খান চৌধুরী, হেদায়ত উল্লাহ তুর্কি, ডা. মআআ মুক্তদীর, ফরিদ সাঈদ, মো. নাজমুল হক শামীম, সুরাইয়া তাহমিনা, ফাতেমা আফরিন, গোলাম আকবর, মো. কামরুল ইসলাম, আলমগীর হোসাইন, গোলাম মোস্তফা তাপস, আল আমিন মিয়াজী, ডা. হাফিজুর রহমান, রিয়াদ মাহমুদ খান, ড. পীরজাদা আজমীরি ও প্রিয় দর্শন বড়ুয়া প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ—যেখানে রয়েছে প্রাচীন জনপদ, সভ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত। ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা।
তারা আরও বলেন, প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচার বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকঐতিহ্য ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ সম্ভব। ইতিহাস চর্চা নব প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং তাদের মধ্যে নৈতিকতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।