উন্নয়নহীনতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা, আওয়ামী লীগ আমলে হয়নি দৃশ্যমান কাজ।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাকৃতিক বিনোদন কেন্দ্র বাঁশখালী ইকোপার্ক আজ অযত্ন, অবহেলা ও উন্নয়নহীনতার কারণে ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে তার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ। একসময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা এই ইকোপার্ক বর্তমানে ভাঙাচোরা অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দর্শনার্থী হারাচ্ছে দিন দিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এখানে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি, বরং আগে থাকা বিভিন্ন স্থাপনাও নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা ভেঙে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পাহাড়, বনাঞ্চল, স্বচ্ছ পানির লেক ও বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত তটরেখা নিয়ে গড়ে ওঠা এই ইকোপার্ক একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণী ও বনজসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর বনভূমি নিয়ে ‘চুনতি অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে বামেরছড়া ও ডানেরছড়া প্রকল্পও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাহাড়, খাল, ছড়া ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই এলাকায় ১৯৯৩ সালে এলজিইডি সেচ প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ি ঢালুতে বাঁধ নির্মাণ করে কৃষি জমিকে চাষাবাদের উপযোগী করা হয়। পরে পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষা, ইকো-ট্যুরিজম ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাঁশখালী ইকোপার্ক।
একসময় এই পার্কে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের সমাগম হতো। বিশেষ করে শীত মৌসুম, ঈদ ও বিভিন্ন ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকত পুরো এলাকা। ঝুলন্ত ব্রিজ, ওয়াচ টাওয়ার, ঐরাবতী বিশ্রামাগার, রিফ্রেশমেন্ট কটেজ ও লেক ছিল পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্কের প্রবেশ সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ। অভ্যন্তরের বেশ কয়েকটি স্থাপনা দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ঝুলন্ত ব্রিজের কাঠ ও লোহার বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে গেছে, ওয়াচ টাওয়ারে উঠতেও ভয় পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। লেকের আশপাশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ভাঙা বেঞ্চ ও আগাছায় ঢেকে থাকা পথ পর্যটকদের হতাশ করছে। ঐরাবতী বিশ্রামাগার ও রিফ্রেশমেন্ট কটেজও অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, আগে পার্কে যে অবকাঠামো ছিল তার অনেক কিছুই এখন আর নেই। কিছু স্থাপনা ভেঙে নষ্ট হয়েছে, আবার কিছু সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “একসময় এই ইকোপার্কে মানুষের ঢল নামত। এখন মানুষ আসে, কিছুক্ষণ ঘুরে হতাশ হয়ে চলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এখানে বড় কোনো উন্নয়ন হয়নি। উল্টো যা ছিল, তারও অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, “আগে পর্যটক বেশি আসতো, ব্যবসাও ভালো ছিল। এখন মানুষ কমে যাওয়ায় দোকানপাটও আগের মতো চলে না। উন্নয়ন না হলে এই পার্কের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।”
চট্টগ্রাম শহর থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক মাহমুদুল হাসান বলেন, “প্রকৃতির সৌন্দর্য এখনো অসাধারণ। কিন্তু অবকাঠামোর অবস্থা খুব খারাপ। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি।”
এক নারী পর্যটক অভিযোগ করে বলেন, “পরিবার নিয়ে এসে স্বস্তিতে ঘোরার পরিবেশ নেই। শিশুদের নিয়ে চলাফেরা করতেও ভয় লাগে। ঝুলন্ত ব্রিজ ও টাওয়ার খুব ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ইকোপার্কের অব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নহীনতার কথা স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রাজনৈতিক নেতা বলেন, “বাঁশখালী ইকোপার্ককে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বড় পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও অবহেলার কারণে সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি পিছিয়ে পড়েছে।”
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সংস্কার, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংযোজন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বিনোদন ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত উন্নয়ন ছাড়া বাঁশখালী ইকোপার্ককে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব নয়। তারা মনে করছেন, সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই ইকোপার্ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পর্যটন কেন্দ্র ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে অবহেলার অন্ধকারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.