কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহেশখালী জোনাল অফিসের বিরুদ্ধে জুন ও জুলাই ২০২৬ মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার অসংখ্য গ্রাহকের দাবি, গত কয়েক মাসের তুলনায় তাদের বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ করেই দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অথচ একই সময়ে এলাকাজুড়ে ছিল ঘনঘন লোডশেডিং, ৩৩ কেভি ফিডারের বারবার ত্রুটি এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বিল পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, জুন ও জুলাই মাসে অনেক এলাকায় প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। কখনো ৩৩ কেভি ফিডারের ত্রুটি, আবার কখনো কারিগরি সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ কম ব্যবহার হলেও বিলে অস্বাভাবিক ইউনিট দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। অনেক গ্রাহকের ভাষ্য, বিলে উল্লেখ করা ইউনিট তাদের স্বাভাবিক ব্যবহার কিংবা আগের মাসগুলোর সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে মিটারের প্রকৃত রিডিং না নিয়েই অনুমাননির্ভর বিল প্রস্তুত করা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, কয়েক মাস ধরে নিয়মিত মিটার রিডার তাদের বাড়িতে যাননি।
গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, অতিরিক্ত বিল সংশোধনের জন্য মহেশখালী জোনাল অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা দ্রুত সমাধান পাননি তারা। অনেকেই লিখিত অভিযোগ জমা দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে মহেশখালীর ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ, কোল্ড স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিনির্ভর ব্যবসায় লোকসান বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে এবং অসুস্থ রোগীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মৎস্যনির্ভর এই উপকূলীয় অঞ্চলে বরফ উৎপাদন, মাছ সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র শিল্পকারখানাও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একাংশের দাবি, বিলিং ব্যবস্থায় আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করা জরুরি। তাদের মতে, প্রতিটি মিটারের প্রকৃত রিডিং সংগ্রহ, ডিজিটাল যাচাই, বিল তৈরির আগে তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং অনলাইনে ইউনিট ব্যবহারের তথ্য দেখার সুযোগ নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসবে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো এলাকায় অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নমুনাভিত্তিক মিটার পরীক্ষা, বিলিং সফটওয়্যার যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে তদন্ত পরিচালনা করা। এতে প্রকৃত সমস্যা থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল, মিটার রিডিং ত্রুটি ও অনুমাননির্ভর বিল নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। ফলে মহেশখালীর ঘটনাও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহেশখালী জোনাল অফিসের জোনাল ম্যানেজারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সচেতন নাগরিকরা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— জুন ও জুলাই মাসের সব বিদ্যুৎ বিল নিরপেক্ষভাবে পুনঃযাচাই, প্রতিটি সংযোগের প্রকৃত মিটার রিডিং মিলিয়ে ভুল বিল সংশোধন, অতিরিক্ত বিল তৈরির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, ৩৩ কেভি ফিডারের ঘনঘন ত্রুটি ও লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ প্রকাশ এবং স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা, পাশাপাশি বিলিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিয়মিত অডিট ও গ্রাহকবান্ধব অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল মহেশখালীতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, পর্যটন, লবণ ও মৎস্য খাতসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি এলাকায় একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, অন্যদিকে বিলিং নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি শুধু গ্রাহকসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনআস্থা, সুশাসন ও সেবার মানের সঙ্গেও সম্পৃক্ত বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রয়োজনে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।