বদলির আদেশ জারির প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় কর্মরত চার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ও এক সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই)। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বদলি আদেশের পরও তারা আগের কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। এমনকি দীর্ঘদিনেও ছাড়পত্র না দেওয়ায় প্রশাসনিক কাজে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে-এমন উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল। এরপরও বদলি আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বদলির আদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন-এসআই আকাশ মাহমুদ ফরিদ, এসআই জুয়েল মজুমদার, এসআই সাইদুর রহমান, এএসআই রুহুল আমিন ভূইয়া এবং এসআই পরিতোষ দাশ। আদেশ অনুযায়ী আকাশ মাহমুদ ফরিদকে বন্দর থানায়, জুয়েল মজুমদারকে পতেঙ্গা মডেল থানায়, সাইদুর রহমান ও এএসআই রুহুল আমিন ভূইয়াকে ইপিজেড থানায় এবং পরিতোষ দাশকে ডিবি দক্ষিণ বিভাগে বদলি করা হয়।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩ মে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে ওই পাঁচ কর্মকর্তাকে অভ্যন্তরীণভাবে বদলি করা হয়। স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বদলি আদেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা।কিন্তু বাস্তবে সে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। বদলির আদেশের পরও কর্মকর্তারা কর্ণফুলী থানায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এতে বদলি আদেশের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় গত ৫ জুলাই জারি করা আরেকটি প্রশাসনিক নির্দেশনায়। সেখানে অভ্যন্তরীণ বদলির আদেশপ্রাপ্ত এসআইদের দীর্ঘদিন পার হলেও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের উদ্দেশ্যে ছাড়পত্র না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ছাড়পত্র না দেওয়ার কারণে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
ওই নির্দেশনায় বদলির আদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের উদ্দেশ্যে ছাড়পত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়। অর্থাৎ, বদলি আদেশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী পর্যায়েও তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।
তবু নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও কর্ণফুলী থানার ওই পাঁচ কর্মকর্তার বদলি কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে-কেন বদলি আদেশের পরও তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হলো না? কার নির্দেশে বা কোন প্রশাসনিক কারণে তারা আগের কর্মস্থলে অবস্থান করছেন? বদলি আদেশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো আপত্তি ছিল কি না, থাকলে তার ভিত্তি কী?
পুলিশ প্রশাসনে বদলি শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং জনবল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কর্মকর্তাকে এক স্থান থেকে অন্যত্র বদলির পরও যদি দীর্ঘ সময় আগের কর্মস্থলে রাখা হয়, তাহলে সেই আদেশের উদ্দেশ্য ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বদলি আদেশ বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব হলে এর কারণ লিখিতভাবে নথিভুক্ত থাকা উচিত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তদন্ত বা বিশেষ প্রশাসনিক প্রয়োজন থাকলে কর্তৃপক্ষ চাইলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তার বদলি স্থগিত বা পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু আদেশ বহাল রেখে দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না করা হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-৫ জুলাইয়ের নির্দেশনায় প্রশাসনিক জটিলতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার পরও বদলি বাস্তবায়নের পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছে। নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে কি না, না হলে তার কারণ কী-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
কর্ণফুলী থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বদলি আদেশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থানও স্পষ্ট করা দরকার।
এখন দেখার বিষয়, তিন মাস ধরে কার্যত স্থবির হয়ে থাকা এই বদলি আদেশ শেষ পর্যন্ত কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হয় এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য বা বিলম্বের জন্য কারও দায় নির্ধারণ করা হয় কি না। একই সঙ্গে বদলি আদেশের পরও কেন পাঁচ কর্মকর্তা আগের কর্মস্থলে অবস্থান করছেন-এই প্রশ্নের উত্তরও চায় সংশ্লিষ্ট মহল।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে তাদের মৌখিকভাবে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এরপর ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য লিখিতভাবে আদেশ দেওয়া হয়। এরপরও যদি তারা ছাড়পত্র না নেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ করা হবে। এরপরও ছাড়পত্র না নিলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.