জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে সরকার যদি বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়, তাতে কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল) লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব। তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রতি শ্রমিকদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ‘যমুনা ভবন’ অডিটোরিয়ামে জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি বন্ধ, অস্থায়ী শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ীকরণ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, বর্তমানে সরকারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও ক্রুড অয়েল আমদানি করে তা পরিশোধন করছে। পরে সেই পরিশোধিত তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে বাজারজাত করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে। দেশের স্বার্থে সরকার যদি বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়, সেক্ষেত্রে তাদের কোনো আপত্তি নেই। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার ও শ্রমিকবান্ধব সরকার। এমন কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন না, যার কারণে জ্বালানি খাত বা দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে সরকারকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, শ্রমিকরা তার সঙ্গে একমত। তবে জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে এয়াকুব অভিযোগ করেন, সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি কুচক্রী মহল শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদ্যমান ২২টি সুনির্দিষ্ট সুবিধা কর্তনের পাঁয়তারা চলছে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রেও গড়িমসি করা হচ্ছে। জ্বালানি খাতে শ্রম আইনকে শ্রমিকবান্ধব রাখার পরিবর্তে শ্রমিকবিরোধী করার তোড়জোড় চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রমিক নেতা বলেন, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বললেও জ্বালানি খাতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিপিসির আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এসএওসিএল, এলপিজিসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে শ্রমিকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর চেষ্টা চলছে। শ্রমিক নেতাদের বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সাধারণত দুই বছর পর পর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে যুগোপযোগী করা হয়। কিন্তু সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ প্রায় ১৯ মাস পার হতে চললেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অবহেলা ও গড়িমসির কারণে নতুন চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। একই সঙ্গে গত ১৭ জুন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর ‘প্রান্তিক সুবিধা নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২২টি সুবিধা কাটছাঁটের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ২(৬২) ধারায় সংজ্ঞায়িত শিল্প বিরোধ ও শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত ২০৯, ২১০ ও ২১১ ধারা রহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন শ্রমিক নেতারা। তাদের দাবি, এসব ধারা রহিত করা হলে শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা সিবিএ নেতাদের কার্যকর ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়বে।
গত ২৬ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা একটি অফিস আদেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ওই আদেশের মাধ্যমে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন)-কে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম মনিটরিং এবং জবাবদিহির বিষয়ে সুপারিশ চাওয়ায় স্পর্শকাতর এই খাতের শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
সমাবেশে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত অস্থায়ী ও ঠিকাদারি শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। শ্রমিক নেতারা বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের অধীনে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে অল্প বেতনে কাজ করে আসছেন অনেক শ্রমিক। কিন্তু নতুন লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না। তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তারা।
মুহাম্মদ এয়াকুব হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জ্বালানি খাতে কাউকে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার সুযোগ দেওয়া হবে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো বাড়তি সুবিধা নয়, তাদের ন্যায্য অধিকার চান। তারা হয়রানি বন্ধ এবং অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত কর্মপরিবেশ চান। জ্বালানি খাতে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জসিম উদ্দিন, এলপিজি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মনির হোসেন, বিপিসি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক সেলিম কবির চৌধুরী, যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মন্নানসহ জ্বালানি খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক-কর্মচারী ও নেতারা। বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন দেশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও এলপি গ্যাস লিমিটেডের সিবিএ সংগঠনগুলো নিয়ে সম্মিলিতভাবে এই সংগঠন গঠিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.