সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একজন সাংবাদিককে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কারণ দর্পণ কখনো শুধু সুন্দর চেহারাটাই দেখায় না।মুখে দাগ থাকলে সেটিও দেখায়। ঠিক তেমনি সাংবাদিকতার কাজও শুধু উন্নয়ন, সাফল্য ও প্রশংসার গল্প তুলে ধরা নয়।সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও মানুষের দুর্ভোগের চিত্রও তুলে ধরা।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় যেন এর উল্টো চিত্রই বেশি দেখা যায়। উন্নয়নের সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকের প্রশংসা হয়, ধন্যবাদ জানানো হয়, চায়ের দাওয়াত দেওয়া হয়। অথচ সেই সাংবাদিকই যখন একই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা এলাকার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তার পরিচয় হয়ে যায় ‘হলুদ সাংবাদিক’!
প্রশ্ন হলো- উন্নয়নের সংবাদ সাংবাদিকতা হলে অনিয়মের সংবাদ কেন সাংবাদিকতা নয়?
একজন জনপ্রতিনিধি একটি রাস্তা নির্মাণ করলেন।একজন কর্মকর্তা একটি ভালো উদ্যোগ নিলেন কিংবা কোনো এলাকায় নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলো- এসব অবশ্যই সংবাদ হওয়ার মতো বিষয়। কিন্তু সেই রাস্তার কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে, প্রকল্পের অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ এলে কিংবা মানুষের দুর্ভোগ তৈরি হলে সেটিও সংবাদ হওয়ার সমান অধিকার রাখে।সাংবাদিক কারও প্রশংসা পাওয়ার জন্য কলম ধরেন না। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে কলম ধরেন।
অবশ্যই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে। অভিযোগ মানেই সত্য নয়। তাই তথ্য যাচাই করতে হবে, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে হবে এবং যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর বক্তব্যও নিতে হবে। মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু কোনো সাংবাদিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনিয়মের প্রশ্ন তুললে তাকে ভয় দেখানো, চাপ দেওয়া কিংবা ‘হলুদ সাংবাদিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদ ভুল হলে তথ্য দিয়ে প্রতিবাদ করা যায়। সাংবাদিকের ভুল থাকলে সংশোধন করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
আরও উদ্বেগের বিষয়, কখনো কখনো সাংবাদিকতার অঙ্গনের কিছু মানুষও সত্য প্রকাশকারী সহকর্মীর পাশে না দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থ, বিজ্ঞাপন কিংবা সম্পর্কের হিসাবকে প্রাধান্য দেন। এতে একজন সাংবাদিক একা হয়ে পড়েন, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয় সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার।
একজন সাংবাদিকের কলম কারও বিরুদ্ধে নয়।কলম অনিয়মের বিরুদ্ধে। একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য নয় বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য।আমাদের বুঝতে হবে, সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। প্রশ্ন মানেই অপমান নয়। আর অনিয়মের সংবাদ মানেই হলুদ সাংবাদিকতা নয়।
যে সাংবাদিক উন্নয়নের সংবাদ প্রকাশ করেন।তিনি যেমন সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়।তেমনি যিনি উন্নয়নের আড়ালে থাকা অনিয়মের প্রশ্ন তোলেন, তিনিও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। কারণ প্রশংসা মানুষকে উৎসাহিত করে আর গঠনমূলক সমালোচনা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেয়।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। সেই স্বাধীনতা যেন কারও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, আবার ক্ষমতাবান কারও চাপেও যেন কণ্ঠরুদ্ধ না হয়।এটাই প্রত্যাশা।
সাংবাদিককে শত্রু মনে করার আগে মনে রাখতে হবে।তিনি সমাজের দর্পণ। দর্পণে নিজের চেহারা পছন্দ না হলে দর্পণ ভাঙার চেষ্টা না করে চেহারার দাগটি মুছে ফেলাই উত্তম।উন্নয়ন নিয়ে লিখলে যদি সাংবাদিক প্রশংসার যোগ্য হন, তাহলে অনিয়ম নিয়ে লিখলেও তিনি দায়িত্বশীলতার স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার। কারণ সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য কাউকে খুশি করা নয়।সত্যকে সামনে আনা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এসো নবীন, এসো প্রবীণ - একসাথে কলম ধরি সত্যের পথে।সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আমাদের কলম হোক ঐক্যবদ্ধ, সাহসী ও আপসহীন। যতই আসুক ঝড়-তুফান, যতই আসুক বাধা-সত্যের পথ থেকে আমরা বিচ্যুত হব না।অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম চলবে নির্ভয়ে মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে থাকবে আমাদের অবস্থান।
জে.এম জাবেদ
গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.