চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন বলে দাবি করা ২৭.১৯৪ একর ভূমি ও জলাশয়ের মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আগ্রাবাদ ডেবা ও ডেবার পাড় এলাকার এই ভূমিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার, রেলওয়ে জামে মসজিদ, সালাউদ্দিন ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। প্রায় ১৩০টি রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এসব কোয়ার্টারে বসবাস করে আসছে। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, শত বছরের পুরোনো ভূমি অধিগ্রহণের নথি, আরএস ও পিএস রেকর্ড এবং বন্দর-রেল সম্পদ বণ্টন নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃবিভাগীয় সভার সিদ্ধান্তে জমিটি রেলওয়ের মালিকানাধীন থাকার বিষয়টি প্রতীয়মান হলেও সর্বশেষ বিএস জরিপে এর ১৮.৯২০ একর ভূমি ও জলাশয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। এই রেকর্ডের ভিত্তিতে চবক জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রেলওয়ের দেওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথির বরাত অনুযায়ী, আগ্রাবাদ ডেবার ২৭.১৯৪ একর ভূমির সঙ্গে রেলওয়ের সম্পর্ক এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯০৮ সালে এলএ প্ল্যানের মাধ্যমে তৎকালীন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে এলএ অ্যাক্ট, ১৮৯৪ অনুযায়ী এসআরভি স্টেশন ইয়ার্ডসহ সংশ্লিষ্ট স্থাপনার প্রয়োজনীয় মাটি কাটার জন্য ভূমিটি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালের আরএস জরিপে আরএস খতিয়ান নং-৯৩৭ মূলে তৎকালীন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের নামে ভূমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়। ১৯৬৩ সালের পিএস জরিপেও পিএস খতিয়ান নং-৫ মূলে তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের নামে জমিটি রেকর্ডভুক্ত থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বন্দর ও রেলওয়ের সম্পদ বণ্টনের ইতিহাসেও আগ্রাবাদ ডেবার জমিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের আগে চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ের কার্যক্রম একীভূত ছিল। পরবর্তীতে দুটি প্রতিষ্ঠান পৃথক হওয়ার পর জমি ও সম্পদ ভাগ-বণ্টনের বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৫৯ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন সচিব (রেলওয়ে ও যোগাযোগ)-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত Proceeding of the Assets and Liabilities Committee প্রতিবেদনে সালাউদ্দিন ইনস্টিটিউটসহ আগ্রাবাদ ডেবা ও ডেবার পাড় এলাকার ২৭.১৯৪ একর ভূমি আপস-বণ্টনের মাধ্যমে রেলওয়ের মালিকানায় থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাবি করেছেন।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালের ১৬ আগস্ট বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও আগ্রাবাদ ডেবা, ডেবার পাড়, সালাউদ্দিন ইনস্টিটিউট ও বিদ্যমান কোয়ার্টারসহ ২৭.১৯৪ একর ভূমি রেলওয়ের মালিকানাধীন থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত আন্তঃবিভাগীয় সভায় আগ্রাবাদ ডেবার পাড়ে বসবাসরত বন্দর কর্মচারীদের বন্দর নর্থ কলোনিতে এবং নর্থ কলোনিতে বসবাসরত রেলওয়ে কর্মচারীদের ডেবার পাড়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৮ সালের ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত আরেকটি আন্তঃবিভাগীয় সভাতেও একই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
তবে রেলওয়ের দাবি, এসব সিদ্ধান্তের পরও আগ্রাবাদ ডেবার পাড় থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মচারীদের বন্দর নর্থ কলোনিতে স্থানান্তর করেনি। বিপরীতে ২০০৬ সালের ৮ জুন বন্দর সাউথ কলোনির ১০.৩০ একর রেলভূমি এবং আইডব্লিউ/পিডব্লিউ এনক্লেভের ৩.১৩ একরসহ মোট ১৩.৪৩ একর জমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সংক্রান্ত নথি ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) কর্তৃক দেওয়া চিঠিতেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এরপর জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের নতুন অধ্যায় শুরু হয় সর্বশেষ বিএস জরিপকে কেন্দ্র করে। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, রেলওয়ের মালিকানা, দখল ও নিয়ন্ত্রণে থাকা ২৭.১৯৪ একর ভূমির মধ্যে ১৮.৯২০ একর ভূমি ও জলাশয় ভুলবশত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নামে বিএস রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। রেলওয়ে এই রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা নং-১২৩/২০২৩ দায়ের করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট মামলাটি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে বালামভুক্ত হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিরোধের এখানেই শেষ নয়। রেলওয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিএস রেকর্ডকে ভিত্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আগ্রাবাদ ডেবা এলাকার প্রায় ১০ কাঠা জমি ক্যাডেট কলেজ ক্লাব চট্টগ্রাম লিমিটেডের কাছে লিজ দেয়। পরবর্তীতে ওই এলাকায় রেলওয়ের সালাউদ্দিন ইনস্টিটিউট বা অডিটোরিয়াম এবং জানাজা ও ঈদের নামাজ আদায় ও শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত মাঠ উচ্ছেদ করে ক্যাডেট কলেজ ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। একইভাবে ক্লাবটির পাশের কিছু জায়গা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠনের কাছেও লিজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিএস রেকর্ড সংশোধনের মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আগ্রাবাদ ডেবা লিজ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল বলে রেলওয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই লিজ কার্যক্রম আর এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে আদালতে বিচারাধীন বিরোধের মধ্যেই সরকারি মূল্যবান জমি লিজ দেওয়ার উদ্যোগের আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও দাবি, আগ্রাবাদ ডেবা সৃষ্টির পর থেকে এটি রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এবং প্রতি তিন বছর অন্তর ডেবা লিজ দিয়ে রেলওয়ে রাজস্ব আদায় করে সরকারি তহবিলে জমা দিয়ে আসছে। একইভাবে ২৭ শেখ মুজিব রোডসংলগ্ন এলাকায় রেলওয়ের জমিতে দোকান লিজ দিয়েও রাজস্ব আয় করা হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন রেলওয়ের দখল ও ব্যবহারে থাকা এবং রেলওয়ে যার মাধ্যমে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করে আসছে, সেই জমির একটি বড় অংশ কীভাবে বিএস জরিপে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ড হলো এবং ওই রেকর্ডের ভিত্তিতে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলো?
রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, আগ্রাবাদ ডেবার পাড়ের জমির গুরুত্ব শুধু মালিকানা বা রাজস্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এলাকাটি এসআরভি স্টেশন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড এবং পাহাড়তলী কারখানার কাছাকাছি হওয়ায় রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এখানে বসবাসরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বল্প সময়ে কর্মস্থলে যাতায়াত করে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় ১৩০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করায় হঠাৎ করে এসব কোয়ার্টার অন্য কোনো সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে রেলওয়ের আবাসন সংকট আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগ্রাবাদ বর্তমানে চট্টগ্রামের অন্যতম মূল্যবান বাণিজ্যিক এলাকা। ফলে ২৭.১৯৪ একর জমির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ হারালে রেলওয়ে শুধু বর্তমান আবাসন সুবিধাই নয়, ভবিষ্যতের বিপুল রাজস্ব সম্ভাবনা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পদও হারাতে পারে। একই সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন সুবিধা কমে গেলে প্রশাসনিক ও অপারেশনাল দায়িত্ব পালনে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে পুরো বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নির্ভর করছে সরকারি ভূমি নথি, অধিগ্রহণের কাগজপত্র, এসএ/আরএস/পিএস/বিএস খতিয়ান, আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃবিভাগীয় সভার কার্যবিবরণী, ২০০৬ সালের জমি হস্তান্তরের দলিল, সংশ্লিষ্ট লিজ চুক্তি এবং আদালতে বিচারাধীন মামলার নথিপত্রের ওপর। বিশেষ করে ১৯০৮ সালের অধিগ্রহণের পর জমিটির ধারাবাহিক মালিকানা, ১৯৫৯ ও ১৯৮৩ সালের সিদ্ধান্তের আইনগত কার্যকারিতা এবং পরবর্তী বিএস জরিপে রেকর্ড পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখা হলে বিরোধটির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে তাই দাবি উঠেছে, আদালতে মালিকানা নিয়ে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আগ্রাবাদ ডেবা, ডেবার পাড়, রেলওয়ে কোয়ার্টার, জামে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নিয়ে কোনো ধরনের দখল, উচ্ছেদ বা নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সরকারি নথি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জমিটির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং রেলওয়ের সম্পদ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা সুরক্ষায় জরুরি প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি ক্ষুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.