অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ব্যয়ের চেয়ে ১ হাজার ৫১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা কম ব্যয়ে আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬ হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা মূল্যমানের ডিপিপি অনুমোদিত হলেও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ৪ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪ লাখ টাকায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে আখাউড়া-লাকসাম সেকশনে ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা ২৩ জোড়া থেকে বেড়ে ৭২ জোড়ায় উন্নীত হয়েছে এবং ট্রেনের রানিং টাইম কমেছে প্রায় ৩০ মিনিট।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল জমি অধিগ্রহণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যা এবং সদর রসুলপুর-রাজাপুর সেকশনের ‘ব্ল্যাক কটন জোনে’ মাটির ভারবহন ক্ষমতা কম থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধান করে প্রকল্পটি গত ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সফলভাবে সমাপ্ত করা হয়। এর আগে ২০২৩ সালের ২০ জুলাই আখাউড়া-লাকসাম সেকশনের আপ ও ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এরপর থেকে নতুন এই রেলপথ দিয়ে দুর্ঘটনা এড়িয়ে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নবম ও শেষ প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মোঃ তানভিরুল ইসলাম। প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় সম্পর্কে তিনি জানান, অনুমোদিত ডিপিপির ৬ হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকার বিপরীতে প্রকল্পটি ৪ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪ লাখ টাকায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ডিপিপি মূল্যমানের তুলনায় ১ হাজার ৫১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরকারি অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। তার মতে, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলী ও পরামর্শকদের সমন্বিত উদ্যোগ, অক্লান্ত পরিশ্রম, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও নিরলস প্রচেষ্টার কারণেই প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে আখাউড়া-লাকসাম রেল সেকশনের অপারেশনাল ক্যাপাসিটি ২৩ জোড়া থেকে বেড়ে ৭২ জোড়ায় উন্নীত হয়েছে। ডাবল লাইন চালু হওয়ায় একই সময়ে উভয় দিক থেকে ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং ট্রেনকে দীর্ঘ সময় ক্রসিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। এর ফলে রেলপথের ব্যবহার সক্ষমতা বেড়েছে এবং ট্রেন চলাচলে সময়ও সাশ্রয় হয়েছে। বিশেষ করে ট্রেনের রানিং টাইম প্রায় ৩০ মিনিট কমে আসায় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সংশ্লিষ্ট রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রসঙ্গত, আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের পাশাপাশি মোঃ তানভিরুল ইসলাম জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন যমুনা রেল সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত পূর্ণ দায়িত্বে এবং ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত দায়িত্বে ওই প্রকল্পে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার দায়িত্ব পালনকালে যমুনা রেল সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয় এবং ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ এই সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলেন, মোঃ তানভিরুল ইসলাম যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনবিশিষ্ট ডেডিকেটেড রেল সেতু হিসেবে যমুনা রেল সেতু দেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে। জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পে যুক্ত থাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশীদার হতে পারাকে মোঃ তানভিরুল ইসলাম তার কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে মনে করেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশীদার হতে পেরে তিনি সন্তোষও প্রকাশ করেছেন।
আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্প সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসন মোঃ তানভিরুল ইসলামকে প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব), বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম পদে পদায়ন করে। তিনি ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলপথের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে আরও নিবিড় তদারকি করা হচ্ছে। রেলপথের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় মেরামত, পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে রেলপথের নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ জোরদার হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী মোঃ তানভিরুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও রেলপথের সার্বিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেল সেকশনে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জবাজার, জামালপুর-ইব্রাহিমাবাদ, ময়মনসিংহ-গৌরীপুর-শ্যামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া ঝাঞ্জাইল, গৌরীপুর-ভৈরববাজার, আখাউড়া-সিলেট, লাকসাম-নোয়াখালী, ষোলশহর-নাজিরহাট এবং ফতেয়াবাদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সেকশনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের অধিকাংশ প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং শিগগিরই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
রেল সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব মেরামত ও পুনর্বাসন কাজ বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চলের রেলপথের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ট্রেন চলাচল হবে আরও নির্বিঘ্ন ও নির্ভরযোগ্য। যাত্রীসাধারণের ট্রেনযাত্রা স্বস্তিদায়ক, আরামপ্রদ ও নিরাপদ করার পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে ভ্রমণের সময়ও কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। অনুমোদিত ডিপিপির তুলনায় ১ হাজার ৫১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি একই সঙ্গে ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা ২৩ জোড়া থেকে ৭২ জোড়ায় উন্নীত হওয়া এবং রানিং টাইম ৩০ মিনিট কমে আসা প্রকল্পটির বাস্তব সুফলকে আরও স্পষ্ট করেছে। ধারাবাহিকভাবে রেলপথের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের রেল যোগাযোগ আরও নিরাপদ, দ্রুত, আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান কার্যালয়: লুসাই ভবন, ৩০৭নং (তয় তলা), মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।মোবাইল: 01759337312, 01749336285 E-mail: dailybartatoday@gmail.com Web: www.bartatoday.com
Copyright © 2026 Bartatoday. All rights reserved.