বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৬ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ: আন্দোলন ও সমাবেশ জোরদার হচ্ছে

জাহাঙ্গীর আলম
  • সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৯৩

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। দেশের মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি হয় এই বন্দরে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার অংশ হিসেবে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনার দায়িত্ব বিশ্বের অন্যতম বন্দর অপারেটর DP World (Dubai Port World)-এর কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১৫ বছরের জন্য NCT-এর অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে।

এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রামসহ জাতীয় পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় অপারেটর, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, পোর্ট ইউজার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মনে করছে—একটি লাভজনক, কৌশলগত ও দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হবে। তারা আশঙ্কা করছে—এ উদ্যোগের ফলে বন্দরের উপর দেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, হাজারো শ্রমিকের কাজ হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং মুনাফার বড় অংশ বিদেশে স্থানান্তরিত হবে। DP World-এর নিকট NCT হস্তান্তরের প্রতিবাদে চট্টগ্রামজুড়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, মশাল মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও অনশনসহ বিভিন্ন আন্দোলন চলছে এবং তা প্রতিদিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে না নামলেও বন্দরকেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সরাসরি-পরোক্ষভাবে এ সিদ্ধান্তকে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে তুলে ধরছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধারাবাহিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলছে—NCT একটি অত্যন্ত লাভজনক টার্মিনাল; বিদেশির হাতে গেলে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হবে। ১২-দল মহাজোট ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি একে ‘দেশীয় নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা’ ও ‘জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচারের কৌশল’ বলে অভিহিত করছে। চট্টগ্রামের বাম দলগুলো—বিশেষ করে CPB ও SPB—ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব, কারণ তাদের ভাষায় NCT বর্তমানে ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা এই ইস্যুতেই ঢাকা–চট্টগ্রাম রোডমার্চ করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) বলছে—নির্বাচিত সরকারের সময় সংসদে আলোচনা ছাড়া এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিদেশিদের হাতে দেওয়া যেতে পারে না।

শ্রমিক সংগঠন ও বন্দর–কেন্দ্রিক সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরাম সরাসরি কর্মসূচিতে না থাকলেও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) মানববন্ধন, মশাল মিছিল, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও অনশন কর্মসূচি পালন করছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেইজারা সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলও একই কর্মসূচিতে সোচ্চার। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মতে, একটি কৌশলগত স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিচালনা করা শ্রমিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে। বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ বলছে—NCT ইজারা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ টেন্ডারের মাধ্যমে দেশীয় বা আঞ্চলিক অভিজ্ঞ অপারেটর নির্বাচন করা উচিত। বন্দর রক্ষা পরিষদ মনে করে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা নির্বাচিত সরকারের সংসদীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে হওয়া বাধ্যতামূলক। বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটরস মার্চেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এবং চট্টগ্রাম ডক বন্দর শ্রমিক উইং সরাসরি আন্দোলনে না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে অন্যান্য সংগঠনগুলোকে মানবসম্পদ ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—চট্টগ্রাম বন্দরের NCT টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শ্রমিকদের জীবিকা এবং কৌশলগত বন্দর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছেস্টেকহোল্ডারদের আন্দোলন–প্রতিবাদ প্রতিদিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে, আর এ অবস্থায় সরকারের সামনে স্বচ্ছতা, ব্যাখ্যা প্রদান এবং স্টেকহোল্ডারদের আস্থা অর্জন এখন সময়ের দাবি।

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের আরো খবর