
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় গভীর রাতে ঘটে যাওয়া বাস-ট্রেন সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত ও আরও অন্তত ২৪ জন আহত হয়েছেন। শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা ৪৫ মিনিটে লালমাই-কুমিল্লা রেল সেকশনের একটি লেভেল ক্রসিংয়ে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে, যা আবারও দেশের রেলক্রসিং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইল ট্রেনটি লালমাই স্টেশন অতিক্রম করে কুমিল্লার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এসময় কি.মি. ১৪৯/৫ এলাকায় অবস্থিত এলসি গেইট নং ই/৪৭ অতিক্রমকালে চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী “মামুন স্পেশাল” পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৭৭৮৩) হঠাৎ রেললাইনে উঠে পড়ে। এতে ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হলে সেটি ইঞ্জিনে আটকে যায় এবং মুহূর্তেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সৃষ্টি হয়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৬ জন নারী ও ৬ জন পুরুষসহ মোট ১২ জন নিহত হন। আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ৫ জন গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ১৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আখাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেন এনে সকাল পর্যন্ত টানা উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা হয়।
এই দুর্ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য আপ ও ডাউন—উভয় রেললাইন বন্ধ হয়ে যায়। পরে সকাল ৭টার দিকে ডাউন লাইন চালু করা হয় এবং ধাপে ধাপে উভয় লাইনই সচল করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পরপরই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় ও জোনাল পর্যায়ে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি কুমিল্লা জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যেখানে বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট দুই গেইটম্যান—মেহেদী হাসান ও মোঃ হেলাল উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় শুধু ব্যক্তিগত অবহেলা নাকি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দায়ী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন নিজস্ব লাইনে নির্ধারিত গতিপথে সিগন্যাল মেনে চলাচল করে। ফলে চাইলেও এটি সড়কযানের মতো তাৎক্ষণিক ব্রেক করে থামানো সম্ভব নয়। ওভারপাস বা গেট থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অসতর্কতা বা অবহেলার কারণে যানবাহন ট্রেনের সামনে চলে আসে, যা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে এমন ঘটনায় ট্রেনকে দায়ী করা অযৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট লেভেল ক্রসিংয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল, কিন্তু তা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বারবার সতর্কতার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।
জেলা প্রশাসন নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যস্ত মহাসড়কের লেভেল ক্রসিংগুলোতে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কঠোর মনিটরিং ও জনসচেতনতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে—এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত দায় কোথায়।