
সমাজের করুণ বাস্তবতা, মানবিক সম্পর্কের গভীরতা ও দাসপ্রথা–পরবর্তী সামন্তবাদী পরিমণ্ডলের কঠিন সত্য তুলে ধরে নির্মিত আর্ট ফিল্ম ‘মায়া’ গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির মূল অডিটোরিয়ামে প্রদর্শিত হয়েছে। দিনব্যাপী দুটি শো অনুষ্ঠিত হয়—প্রথমটি বিকাল ৫টা থেকে ৬টা এবং দ্বিতীয়টি সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে শিল্পী–সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের উপস্থিতিতে শিল্পকলার পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর।
দুই প্রদর্শনীর মধ্যবর্তী বিরতিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চলচ্চিত্রটির পরিচালক নাসরীন হীরা, সঞ্চালনায় ছিলেন শাহীন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ থিয়েটার ফোরামের সভাপতি হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রভাষক মোস্তফা কামাল যাত্রা, লোক থিয়েটারের দলপ্রধান মনসুর মাসুদ, বীজন নাট্য গোষ্ঠীর সহদলপ্রধান রূপায়ন বড়ুয়া, সার্ক মানবাধিকার সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি ইনজিনিয়ার শাহীন চৌধুরী, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা মোশারফ ভূঁইয়া পলাশসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
নাসরীন হীরার পরিচালনায় নির্মিত ‘মায়া’র চিত্রনাট্য লিখেছেন শাহীন চৌধুরী। সংগীত পরিচালনা করেছেন ফরিদ বঙ্গবাসী, কণ্ঠ দিয়েছেন সেলিম ও তাবাসসুম তামান্না। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন সায়েম উদ্দিন এবং শিল্প নির্দেশনা ও সহকারী পরিচালনায় ছিলেন বড়ুয়া সিমান্ত। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে নিমবার, এঞ্জেলা আর্ট এবং প্রভাতী শিশু কিশোর আনন্দ উৎসব।
দাসপ্রথা–পরবর্তী সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরা এই চলচ্চিত্রের গল্পে দেখা যায়—চিকিৎসার অভাবে বাবা-মায়ের মৃত্যুতে এক দরিদ্র ভাইয়ের ওপর নেমে আসে সংসারের ভার। একমাত্র বোনকে লেখাপড়া শেখানোর স্বপ্ন থাকলেও দারিদ্র্য ও সামাজিক কুসংস্কার তাদের জীবনকে পিছনে ঠেলে দেয়। অল্প বয়সে বোনকে বিয়ের মাধ্যমে সংসারী হতে হয়, যেখানে তাকে সহ্য করতে হয় অকথ্য নির্যাতন। এক ঝড়ো রাতে পরিবারের লোকজন বাইরে গেলে বোনকে তালাবন্দি রেখে যাওয়া হয়। ভয়ে বোন ভাইকে ফোন করলে সে ছুটে আসে তাকে রক্ষায়, কিন্তু বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। ভাইয়ের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে বোনও আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
নির্মাতা নাসরীন হীরা বলেন, “মায়া সমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদক, বখাটেদের উৎপীড়নসহ নানা সামাজিক ব্যাধির নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। দেড় বছর কঠোর পরিশ্রমের পর এটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রামে সৃজনশীল কাজে উপযুক্ত স্পন্সর ও প্রডিউসারের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।”
অতিথিদের মতে, ‘মায়া’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়—এটি দর্শকের হৃদয়ে প্রশ্ন তোলে, সমাজ বাস্তবতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। প্রদর্শনীতে দর্শকদের আবেগমথিত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, চলচ্চিত্রটি সমাজের গভীরতম ক্ষতচিহ্নগুলো তুলে ধরে মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রামে ‘মায়া’র প্রদর্শনী সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে চলচ্চিত্রটি।