
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত বিজিবির ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজ (বিজিটিসিএন্ডসি)’-এর বীর উত্তম মজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বিজিবির ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক ৩ হাজারেরও বেশি নবীন সদস্য দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন সৈনিকদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং বিজিটিসিএন্ডসি’র কমান্ড্যান্টসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সকালেই মাননীয় উপদেষ্টাকে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ শুরু হয়। কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথি নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
মাননীয় উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিজিবি আজ একটি সুসংগঠিত, চৌকষ, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার দেশপ্রেমিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বিজিবি দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “শৃঙ্খলাই সৈনিক জীবনের অলংকার। আদেশ ও কর্তব্য পালনে যে কখনো পিছপা হয় না, সেই প্রকৃত সৈনিক।” সততা, বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, আনুগত্য, তেজ ও উদ্দীপনাকে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মূল ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নবীন সৈনিকরা এসব গুণাবলি ধারণ করে বিজিবির ঐতিহ্যকে আরও সমুন্নত রাখবে। তিনি বিজিবির চার মূলনীতি—মনোবল, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও দক্ষতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
মাননীয় উপদেষ্টা নবীন সৈনিকদের প্রদর্শিত তেজোদীপ্ত কুচকাওয়াজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাদের কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্য কামনা করেন। তিনি ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচে সর্ববিষয়ে সেরা হওয়ায় বক্ষ নম্বর ১৫৫ রিক্রুট আল ইমরানকে বিশেষ অভিনন্দন জানান। এছাড়া শারীরিক উৎকর্ষতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী বক্ষ নম্বর ২৭৬৯ শপিকুল ইসলাম (পুরুষ) ও বক্ষ নম্বর ১৫১৫ রিক্রুট লুবনা খাতুন (মহিলা) এবং শ্রেষ্ঠ ফায়ারার হিসেবে বক্ষ নম্বর ১৩৪৭ রিক্রুট শফিকুর রহমান তামিম (পুরুষ) ও বক্ষ নম্বর ১৫৩১ রিক্রুট নাহিদা আক্তার (মহিলা)-কেও অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও জানান, বিজিটিসিএন্ডসি গত ৪৪ বছর ধরে বিজিবির রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি ব্যাচকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। যদিও এই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ৭০০ থেকে ১ হাজার জন, তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা ও বিজিবি সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে ১০৪তম ব্যাচে একযোগে ৩ হাজার ২৩ জন (পুরুষ ২ হাজার ৯৫০ জন ও মহিলা ৭৩ জন) রিক্রুটকে মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিজিটিসিএন্ডসি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নবীন সৈনিকদের অংশগ্রহণে আকর্ষণীয় ট্রিক ড্রিল এবং বিজিবির সুসজ্জিত বাদকদলের মনোজ্ঞ ব্যান্ড ডিসপ্লে প্রদর্শিত হয়। নবীন সৈনিকদের চৌকষ দল কর্তৃক মাননীয় উপদেষ্টাকে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মধ্য দিয়ে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।