শিরোনাম
বাঁশখালীতে ‘আমার গ্রাম’-এর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন ড. জকরিয়া ৪৮ বছরে বিএনপি: জিয়ার আদর্শ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর প্রত্যয়ে নাঙ্গলমোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযান: দেশীয় মদসহ দুই মাদক কারবারি আটক ‘কিছু ব্যবসায়ী কি ভোক্তাদের আদিম যুগে ফেরত নিতে চান?’—ক্যাব চট্টগ্রাম জিইসির আল-হেলাল হোটেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ৩ লাখ টাকা জরিমানা পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তি: যমুনা টিভির প্রতিবেদন ‘ভুল ব্যাখ্যাভিত্তিক’ দাবি রেলের সাতকানিয়ার ইউএনওর বিরুদ্ধে প্রচারণা: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি স্বার্থের সংঘাত? চট্টগ্রাম ওয়াসায় পিপিপি প্রকল্প উন্নয়ন বিষয়ক ৩ দিনব্যাপী বুটক্যাম্প শুরু ২,৭১২ কোটি টাকার এনসিটি যাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে, বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ অপরাহ্ন

৪৮ বছরে বিএনপি: জিয়ার আদর্শ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর প্রত্যয়ে

জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দীর্ঘ পথচলা পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ / ৩৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ৪৮ বছরে পদার্পণ করছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় দলটি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন, দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের রাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন এবং নানা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। ফলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বয়সের হিসাব নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায়ও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগোচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বড় পরিবর্তন আসে। এমন এক সন্ধিক্ষণে জাতীয়তাবাদ, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সামনে রেখে জিয়াউর রহমান একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, পথ ও পেশার মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটি অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে তিনি ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করে তোলে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি কৃষি ও উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচিতে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কৃষি ও উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আত্মনির্ভরশীলতা, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনায় জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পথচলা থেমে থাকেনি।

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়ের ধারণা দলটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়ও বিএনপির ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্ব পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হওয়ার কারণে দলটির রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিতে পরিবর্তন এলেও জাতীয় স্বার্থ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি দলটির রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উপস্থাপিত হয়ে আসছে।

প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে সরকার গঠন করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে কৃষি, শিল্প, গ্রামীণ উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যক্তি উদ্যোগ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম বড় অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এর পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতের বিকাশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়। একই সময়ে ওই সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রশাসনিক নানা বিষয়ে সমালোচনাও ছিল। একটি রাজনৈতিক দলের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যেমন অর্জন ও সাফল্য বিবেচনায় নিতে হয়, তেমনি বিতর্ক ও সমালোচনার বিষয়গুলোও ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

পরবর্তী সময়ে নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, রাজনৈতিক সংস্কার ও ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ অস্থিরতা তৈরি হয়। বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে নির্বাচন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করে। দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। একই সঙ্গে আন্দোলনের কৌশল, নির্বাচন বর্জন, রাজনৈতিক সংঘাত ও নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি করেছে।

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিরোধী দলের নেতৃত্ব—বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্ব দলটির রাজনৈতিক বিস্তার ও সাংগঠনিক ভিত্তিকে প্রভাবিত করেছে। জিয়াউর রহমানের পর তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।

বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যকে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি সেই নতুন রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম প্রতীক হিসেবে সামনে এসেছে। এই স্লোগানের মূল বক্তব্য হলো দল, ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ এবং বর্তমান সময়ের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—দুটি রাজনৈতিক উচ্চারণের মধ্যেই দেশ ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও বদলেছে। নতুন প্রজন্ম এখন শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, তারা চায় কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনের শাসন, নিরাপত্তা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ফলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এর বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে।

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এবং বিরোধী দলের রাজনীতি—দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দলটির সামনে যেমন বড় রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি এটি জনগণের কাছে বড় ধরনের জবাবদিহিতার বিষয়ও। ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু রাজনৈতিক বিজয় নয়; বরং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার দায়িত্ব গ্রহণ করা।

বিশেষ করে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও বিএনপির সামনে গুরুত্বপূর্ণ। যে দল দীর্ঘদিন জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন করেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেটিই হবে অন্যতম বড় পরীক্ষা। কার্যকর সংসদ, স্বাধীন গণমাধ্যম, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি শক্তিশালী করাও সময়ের দাবি।

৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির ইতিহাসে যেমন রয়েছে রাজনৈতিক সাফল্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে আন্দোলন, সংকট, বিতর্ক ও সমালোচনা। জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়—এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কীভাবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া যায়। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়। একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, কর্মসংস্থানমুখী ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজ ৪৮ বছরে। সময় বদলেছে, নেতৃত্বের প্রজন্ম বদলেছে, বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ঐতিহাসিক উপস্থিতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারলে দলটির সামনে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই প্রত্যাশা—জিয়ার জাতীয়তাবাদী চেতনা, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতা এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর প্রত্যয় যেন বাস্তব রাষ্ট্রনীতি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ নেয়। ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’-এর ঐতিহাসিক আবেগ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর নতুন অঙ্গীকার—এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জনগণের প্রত্যাশার বাংলাদেশ নির্মাণে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া।

৪৮ বছরে বিএনপি—ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যয় এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ।

লেখক:
কাজী সরোয়ার খান মনজু
সাবেক দপ্তর সম্পাদক,
জাসাস, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ