বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

সব সূচকে শীর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার, কার্গো, রাজস্ব ও দক্ষতায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য

জাহাঙ্গীর আলম
  • শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫০

কাস্টমসের কলম বিরতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মঘট ও বৈশ্বিক লজিস্টিক চাপে জর্জরিত একটি বছরেও চট্টগ্রাম বন্দর প্রমাণ করেছে তার সক্ষমতা, স্থিতিস্থাপকতা ও নেতৃত্ব। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে কন্টেইনার, কার্গো, জাহাজ হ্যান্ডলিং, রাজস্ব আয় ও অপারেশনাল দক্ষতা—সবকটি সূচকেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জনের মাধ্যমে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।

বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট সাধারণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবাহী পণ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। ২০২৫ সালে বন্দরে মোট ৩৪,০৯,০৬৯ টিইইউএস কন্টেইনার, ১৩,৮১,৫১,৮১২ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪,২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.০৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সংখ্যাগত হিসেবে অতিরিক্ত ১,৩৩,৪৪২ টিইইউএস কন্টেইনার, ১,৪১,৬৮,৭৯৮ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪০৬টি জাহাজ বেশি হ্যান্ডলিং সম্ভব হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ৩৪ লক্ষ টিইইউএস ছাড়িয়ে যায়, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। বিশেষ করে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৩.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক কার্গো বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে এবং জাতীয় লজিস্টিকস চেইন সচল রাখতে বন্দরের শক্ত অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে।

প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বন্দরের আরেকটি বড় অর্জন হলো জাহাজের ওয়েটিং টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসা। সেপ্টেম্বর মাসে ৯ দিন, অক্টোবর মাসে ১৮ দিন এবং নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে টানা ২৬ দিন করে জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূন্য ছিল। বর্তমানে বন্দরে আগত জাহাজগুলো অন অ্যারাইভাল বার্থ পাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর ২০২৫ সময়ে জাহাজের গড় টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম ছিল মাত্র ২.৫৩ দিন এবং কন্টেইনার ডুয়েল টাইম ছিল ৯.৪৪ দিন। এর ফলে আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য খালাস নিতে পারছেন এবং রপ্তানিকারকরা সময়মতো জাহাজীকরণ করতে পারছেন, যার সার্বিক প্রভাবে পোর্ট লিড টাইম কমেছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতে গতি এসেছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও ২০২৫ সাল ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ঐতিহাসিক। এ বছরে বন্দরের মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫,৪৬০.১৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩,১৪২.৬৮ কোটি টাকা, যা ৭.৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। পাশাপাশি সরকারকে ১,৮০৪.৪৭ কোটি টাকা প্রদান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে জাতীয় কোষাগারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোট অবদান দাঁড়িয়েছে ১২,৩৪৯.৫০ কোটি টাকা।

দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বন্দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ হালনাগাদ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডম (IDOM)-এর সুপারিশ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত নতুন ট্যারিফ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ এবং ১৪ অক্টোবর থেকে কার্যকর করা হয়, যা বন্দরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

ডিজিটালাইজেশন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বন্দর যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS)-এর মাধ্যমে অনলাইন ই-গেট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও অনলাইন বিল কালেকশন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বন্দর কার্যক্রম হয়েছে দ্রুত, স্বচ্ছ ও পেপারলেস। গত ২৩ ডিসেম্বর একদিনে সর্বোচ্চ ৬,৭৬১টি গেট পাস ইস্যু হওয়া এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও ব্যবহারকারীদের আস্থার স্পষ্ট প্রমাণ।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউএস কোস্টগার্ড ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি (আইপিএস) দলের পরিদর্শনে ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন বন্দরের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান কন্টেইনার চাপ মোকাবিলায় ২০২৫ সালে বন্দরে ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ, আধুনিক হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ এবং কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে-টার্মিনাল, লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল ও পানগাঁও আইসিটির মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে রূপান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য কেবল রেকর্ডের বছর নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের বছর। প্রতিকূলতার মাঝেও দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর আজ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের আরো খবর