
চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গণে এক শহীদ পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জুলাই বিপ্লবের শহীদ মোহাম্মদ ইউসুপের পিতা মোহাম্মদ ইউনুছ অভিযোগ করেছেন, আদালতে ন্যায়বিচারের আবেদন জানাতে গিয়ে তিনি উশৃঙ্খল আইনজীবীদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
শহীদ পরিবারের আকুতি
মো. ইউনুছ তাঁর লিখিত আবেদনে জানান, ৫ আগস্ট ২০২৪-এ চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাঁর ছেলে শহীদ ইউসুপ প্রাণ হারান। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় (ডবলমুরিং থানার মামলা নং ৮(৪)/২০২৫, জি.আর. নং ৭৬/২০২৫) পুলিশ প্রভাবিত হয়ে একজন নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মী মোহাম্মদ নওশেদ জামানকে গ্রেপ্তার করে।
শহীদ ইউসুপের পিতা হিসেবে তিনি ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আদালতে গিয়ে নওশেদ জামানের জামিনে আপত্তি নেই বলে আবেদন জমা দেন। কিন্তু এখানেই ঘটলো চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তাঁর ভাষায়, “আমি যখন ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলি, তখন কিছু আইনজীবী দলবদ্ধভাবে আমাকে গালিগালাজ করে, মারধর করে এবং আদালত থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তারা হুমকি দিয়ে বলে, যদি আবার আদালতে আসি, তবে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হবে।”
আঘাত শুধু ব্যক্তির নয়, বিচার ব্যবস্থারও
শহীদ ইউসুপের পিতা বলেন, এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং শহীদের মান-মর্যাদার ওপর নগ্ন আঘাত এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর চরম হস্তক্ষেপ। আদালত প্রাঙ্গণ, যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আসে, সেখানেই যদি একজন শহীদ পিতা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও প্রত্যয়নপত্র
ঘটনার আরেকটি দিক হলো গ্রেপ্তার হওয়া আসামি নওশেদ জামান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগর তাঁকে সংগঠনের সদস্য (রুকন) এবং বাগমনিরাম দক্ষিণ সাংগঠনিক ওয়ার্ড সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নওশেদ জামান রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেও তাঁকে হত্যার মামলায় জড়ানো হয়েছে “সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে”।
প্রভাবশালী মহলের ছায়া?
আইনজীবীদের এমন উশৃঙ্খল আচরণ প্রশ্ন তুলছে—কাদের স্বার্থে একজন শহীদ পিতাকে আদালত থেকে বের করে দেওয়া হলো? নওশেদ জামানের মুক্তি দাবি আদালতের ভেতর-বাহিরে কোন মহলকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল? আর এর পেছনে কি রাজনৈতিক চাপ কিংবা প্রভাবশালী চক্র সক্রিয়?
তদন্ত দাবি
মো. ইউনুছ ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “শহীদের পিতাকে আদালতে লাঞ্ছিত করা মানে পুরো জাতিকে লাঞ্ছিত করা।”
এই ঘটনা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বর্তমান সংকটের প্রতিচ্ছবি। যেখানে আদালত প্রাঙ্গণেই যদি একজন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা না পান, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে শহীদ পরিবারের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থতা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে।
এমন একটি ঘটনায় আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আদালতের ভেতরে সন্ত্রাসী আচরণ শুধু বিচার প্রক্রিয়াকে নয়, গোটা সমাজকেই অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।