
বাংলাদেশ রেলওয়ের ফিল্ড কানুনগো পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে জাল সনদ ব্যবহার, কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের তীর রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) সর্দার শাহাদাত আলীসহ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রের দিকে। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে চলমান তদন্তের ধীরগতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে রাজস্বখাতভুক্ত ফিল্ড কানুনগো (গ্রেড-১৩) পদে ৬ জন নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে প্রার্থীদের জন্য চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন সার্ভে সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, এই শর্ত উপেক্ষা করে একাধিক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইদ্রিস আলী নামে এক প্রার্থী প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে জাল সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ পান এবং বর্তমানে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি এক প্রভাবশালী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর আত্মীয় হওয়ায় সাবেক ডিজির মাধ্যমে এ সুযোগ পান। একইভাবে সিদ্দিকুর রহমান, আবু জাফর গাফফারি ও বিপ্লব কুমার রায়ের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চারজনই বিপুল অর্থের বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে রেলওয়ের একটি দাপ্তরিক পত্র অনুযায়ী ফিল্ড কানুনগো পদে মোট ২১টি পদের মধ্যে ১৩টি সরাসরি নিয়োগ, ১টি সংরক্ষিত এবং ৫টি পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে, বাকি ৩টি পদ শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, জাল সনদে নিয়োগ পাওয়া অন্তত চারজনের নিয়োগ বাতিল করা হলে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন হবে। কিন্তু এখনো এসব নিয়োগ বাতিলের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শুরু হওয়ার খবর পেয়ে অভিযুক্তদের কেউ কেউ কৌশলে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এর মধ্যে আবু জাফর গাফফারি অন্যত্র চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এবং ইদ্রিস আলী পূর্বের কর্মস্থল থেকে আইবাস++ সিস্টেমে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র ছাড়াই নতুন পদে বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ইদ্রিস আলী প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রামে দখল ও ঘুষের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এবং বরাদ্দ ছাড়াই উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত অফিসার্স কোয়ার্টারে অবস্থান করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী মো. নাঈম হোসেন দাবি করেছেন, তিনি ডিপ্লোমা ইন সার্ভে সনদধারী হয়েও লিখিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেও নিয়োগ পাননি। তিনি ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তার অভিযোগ, “সব যোগ্যতা থাকার পরও আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তদন্ত চলছে, কিন্তু তা অত্যন্ত ধীরগতিতে।” বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইডিইবি) থেকেও আপত্তি জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর সনদ ভুয়া প্রমাণিত হলে তার নিয়োগ বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) এ এম সালাউদ্দিন বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অভিযুক্তরা এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিল্ড কানুনগো পদটি ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ও কারিগরি নির্ভর হওয়ায় এখানে অনিয়ম হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।