চট্টগ্রামে খাদ্য ও মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকে ‘হয়রানি’ হিসেবে উল্লেখ করে তা বন্ধের দাবি তোলার সমালোচনা করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী কি ভোক্তাদের আদিম যুগে ফেরত নিতে চান?’
৩১ আগস্ট (সোমবার) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও নগর কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, সম্প্রতি চট্টগ্রামের কিছু খাদ্য ও মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নেতৃবৃন্দের কাছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকে ‘হয়রানি’ হিসেবে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি ক্যাবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ক্যাবের নেতাদের দাবি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআইয়ের বাজার তদারকি অভিযানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন নামিদামি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসছে। এসব অভিযানে খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের ও মানহীন রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণ, বিপণন ও পরিবহনসহ নানা ধরনের অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর তা সংশোধন ও প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে কিছু ব্যবসায়ী তদারকি ও অভিযান বন্ধের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফন্দি-ফিকির ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছেন। ক্যাব নেতৃবৃন্দের মতে, এ ধরনের প্রবণতা শুধু ভোক্তাদের অধিকারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, শত বছরের পুরোনো চট্টগ্রাম চেম্বার শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করেনি; এতদাঞ্চলের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিরসনেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। খাদ্য ও মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হলেও সর্বস্তরের ব্যবসায়ী এবং তাদের পরিবার-স্বজনরাও একই বাজারের ভোক্তা। ফলে খাদ্যে ভেজাল ও মানহীনতার বিস্তার ঘটলে ব্যবসায়ী সমাজও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। এ কারণে গুটিকয়েক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর একতরফা বক্তব্যে সায় না দিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
ক্যাব নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, গত ২০ জুন ২০২৬ চট্টগ্রামে নিরাপদ খাদ্য আদালতের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া যায়। চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোস্তফার সরেজমিন পরিদর্শনে খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণে বিষাক্তদ্রব্য হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বা উপস্থিতি, চানাচুর, চিড়া ও বুট উৎপাদনে পোড়া তেলের ব্যবহার, প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ, খাদ্যপণ্য মোড়কীকরণে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য সংযোজনের মতো অনিয়ম ধরা পড়ে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ম্যাংগো ফ্রুট পাল্প সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্যকর্মীদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করার বিষয়ও পরিদর্শনে উঠে আসে। বিভিন্ন পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন, নিম্নমানের খাদ্যপণ্য তৈরি, বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে তা ব্যবহারের অভিযোগ, খাদ্য স্পর্শক হিসেবে খোলা কাগজ ও খবরের কাগজ ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বিক্রির উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে মোড়কীকরণ না করার মতো নানা অসঙ্গতিরও প্রমাণ পাওয়া যায় বলে জানায় ক্যাব।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, ভোক্তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বাজারে মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ত্রুটি সংশোধন ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদনে বাধ্য করতে হবে।
তারা আরও বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বাজার তদারকি কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত না করে ব্যবসায়ীদের উচিত নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা এবং আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির আধুনিকায়নে মনোযোগ দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক মো. সেলিম জাহাঙ্গীর, সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস এবং ক্যাব যুব গ্রুপ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আবু হানিফ নোমানসহ অন্যরা।
ক্যাব চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম আরও জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই এবং জনস্বার্থে এ ধরনের তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।