পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম বন্দরে ৮.৪২ মেগাওয়াট (পিক) উৎপাদনক্ষমতার রুফটপ সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সঙ্গে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের (জিজিআই) একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে আগামী ২০ বছরে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জিজিআইয়ের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। জিজিআইয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ নূরে আলম।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নির্দেশনা এবং গ্রিন পোর্ট ইনিশিয়েটিভের আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন ভবন ও শেডের অব্যবহৃত ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৮.৪২ মেগাওয়াট পিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বেসরকারি বিনিয়োগে অপারেটিং এক্সপেন্ডিচার (ওপেক্স) মডেলে বাস্তবায়ন করা হবে। জিজিআই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ফলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে শুরুতে কোনো মূলধনী বিনিয়োগ বা অর্থায়ন করতে হবে না।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ, নির্মাণ, পরীক্ষা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে জিজিআই। অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তিতে নির্ধারিত স্থির ট্যারিফ অনুযায়ী উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরবর্তী ২০ বছর ধরে এ প্রকল্প থেকে বন্দরে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগের ফলে বন্দরের দৈনন্দিন বিদ্যুতের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রচলিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে প্রকল্পটি নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের কোনো অংশ বন্দরের তাৎক্ষণিক চাহিদার অতিরিক্ত হলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর এ উদ্যোগ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের ক্ষেত্রেও এ প্রকল্প ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ বন্দরের কার্যক্রমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বন্দর আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বন্দর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।