ডালাসের বিশ্বকাপের রাতটি যেন শুধুই লিওনেল মেসির জন্য লেখা ছিল। শুরুতে পেনাল্টি মিস করে হতাশ করলেও, পরে ইতিহাস গড়ে জোড়া গোলে দলকে জিতিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বলা হয়।
মেসির দুর্দান্ত নৈপুণ্যে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচের দুটি গোলই আসে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের পা থেকে। প্রথম গোলটি তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে, আর দ্বিতীয় গোলটি নিশ্চিত করেছে দলের টানা দ্বিতীয় জয়।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। দ্বিতীয় মিনিটেই এনসো ফের্নান্দেস বাম দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে গোলের চেষ্টা করেন, যদিও বল সাইড নেটে লাগে। চার মিনিটের মাথায় লাউতারো মার্তিনেসকে ফাউল করায় ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা।
নবম মিনিটে ইতিহাস গড়ার সুযোগ পান মেসি। কিন্তু তার নেওয়া শট ডান পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে গেলে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম। তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
পেনাল্টি মিসের পরও বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখে আর্জেন্টিনা। অস্ট্রিয়া মাঝেমধ্যে আক্রমণে উঠলেও আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগ ছিল দৃঢ়। ২৩ মিনিটে মার্সেল সাবিৎসারের শট কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন রোমেরো। এরপর ৩২ মিনিটে প্রায় নিশ্চিত গোল থেকে মেসিকে বঞ্চিত করেন কেভিন ডানসো।
অবশেষে ৩৮ মিনিটে আসে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। বাঁ দিক থেকে গড়ে ওঠা আক্রমণে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শটে জাল খুঁজে নেন মেসি। গোলের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বকাপে নিজের ১৭তম গোল করে তিনি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে যান। পাশাপাশি টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি।
প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
বিরতির পর অস্ট্রিয়া কিছুটা বেশি বলের দখল পেলেও আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। ৫৬ মিনিটে সাবিৎসারের ফ্রি-কিক দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। তিন মিনিট পর হাঁটুর সমস্যায় মাঠ ছাড়েন রোমেরো, তার বদলি হিসেবে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি।
ম্যাচের শেষ দিকে একের পর এক পরিবর্তন এনে আক্রমণ ও রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রাখেন স্কালোনি। হুলিয়ান আলভারেস, নিকোলাস গনসালেস, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো মাঠে নেমে দলকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়া মার্কো আরনাউতোভিচ, আলেক্সান্ডার প্রাস, মার্কো ফ্রাইডল, প্যাট্রিক ভিমার ও কার্নি চুকুয়েমেকাকে নামিয়েও ম্যাচে ফিরতে পারেনি। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে ভিমারের হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে গেলে শেষ হয়ে যায় তাদের সম্ভাবনা।
এর এক মিনিট পরই আবারও জ্বলে ওঠেন মেসি। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেসের শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বল পেয়ে প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় চেষ্টায় কেভিন ডানসোকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
এই বিশ্বকাপে এটি মেসির পঞ্চম গোল এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮-তে। রেকর্ড ভাঙার রাতে জোড়া গোল করে নিজের কিংবদন্তিকে আরও উজ্জ্বল করেন তিনি। শেষ মুহূর্তে একটি ফ্রি-কিক থেকেও হ্যাটট্রিকের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, তবে বল অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির। রেকর্ড, জোড়া গোল এবং টানা দ্বিতীয় জয়ে ভর করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা নিশ্চিত করে শেষ বত্রিশের টিকিট। আর ডালাসের এই রাত ইতিহাসে লেখা থাকবে—একজন লিওনেল মেসির নামে।