চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে মো. হারুনকে ঘিরে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হারুন কীভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ডেলিগেট কার্ড নিয়ে প্রবেশের সুযোগ পেলেন—এমন প্রশ্ন তুলেছেন আনোয়ারা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের তৃণমূল বিএনপি নেতা-কর্মীদের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তাদের অনেকেই যখন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে জায়গা পান না, তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুষ্ঠানে ডেলিগেট হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পান, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ অনুযায়ী, মো. হারুনের বাবা আনোয়ার হোসেন কন্ট্রাক্টর দীর্ঘদিন আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিভিন্ন প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনেও তাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে হারুনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না। তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁর নিজের আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতা এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই আনোয়ারায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচিতে হারুন উপস্থিত ছিলেন। তৃণমূলের দাবি, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা এম এ রশিদ এবং বারশত ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুমের নেতৃত্বে ওই কর্মসূচিতে লাঠি হাতে হারুন অবস্থান নিয়েছিলেন।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক ব্যক্তি দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আবারও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন বলেও অভিযোগ তাদের। এতে দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে থাকা ত্যাগী নেতা-কর্মীরা নিজেদের এলাকায় এখনো কোণঠাসা বোধ করছেন বলে দাবি করছেন।
এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে ৯ আগস্ট তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে রেডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার পর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও পোস্টে দেখা যায়, মো. হারুনের গলায় ডেলিগেট কার্ড রয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিএনপির নেতা-কর্মীদের জন্য বরাদ্দ করা কার্ড ব্যবহার করে তিনি অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেন এবং সামনের সারিতে বসার সুযোগ পান। এর পরপরই ফেসবুকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—দলের দুঃসময়ের ত্যাগী কর্মীরা যেখানে কার্ড পাননি, সেখানে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজন কীভাবে ডেলিগেট হলেন?
একটি পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, রেডিসন ব্লুতে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে একজনকে ‘তৃণমূল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা বিএনপি পরিবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আরেকটি পোস্টে বলা হয়, যে ডেলিগেট কার্ড পাওয়ার কথা ছিল দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের, সেই কার্ড নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তির অনুষ্ঠানে প্রবেশ অত্যন্ত হতাশাজনক। এসব পোস্টে দলীয় নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি এবং ডেলিগেট কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, পুলিশি হয়রানি কিংবা রাজনৈতিক নির্যাতনে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের রাজনৈতিক অতীত যাচাই না করে যদি বর্তমানে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়, তাহলে দলের ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে। তাদের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে যারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সুবিধা নিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তাদের কেউ কেউ বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরি করেছেন। ফলে তৃণমূলের পুরোনো নেতা-কর্মীরা সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
তৃণমূলের ক্ষোভের আরেকটি জায়গা হলো—দলের দুঃসময়ের ইতিহাস। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত মামলা মোকাবিলা করেছেন, আদালতে হাজিরা দিয়েছেন, কারাগারে গেছেন, হামলার শিকার হয়েছেন এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অথচ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর যদি তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে সুবিধাভোগী কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিরা দলের সামনে চলে আসেন, তাহলে ভবিষ্যতে আবার কঠিন সময় এলে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা দলের পাশে থাকবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তৃণমূলের একজন নেতা বলেন, “আমরা যখন মামলা-হামলা নিয়ে রাজপথে ছিলাম, তখন যারা আমাদের পাশে ছিলেন না, তারা এখন কীভাবে দলের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করেন—এই প্রশ্নের জবাব আমরা নেতৃত্বের কাছে চাই।”
তাদের দাবি, রেডিসন ব্লুর মতবিনিময় সভায় কারা ডেলিগেট ছিলেন, কোন সাংগঠনিক ইউনিট থেকে তারা মনোনীত হয়েছেন, কার সুপারিশে কার্ড পেয়েছেন এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী—এসব তথ্য প্রকাশ করা হোক। এতে অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, তা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন তারা।
একই সঙ্গে তৃণমূলের একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি নেতা-কর্মীদের নির্যাতন বা হয়রানিতে ভূমিকা রেখেছেন—এমন অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির তৃণমূলের এই ক্ষোভ এখন শুধু মো. হারুনকে ঘিরে নয়; এটি দলের অভ্যন্তরে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন, নতুন করে দলে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের যাচাই এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ত্যাগের চেয়ে যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। তাদের ভাষায়, “আজ যারা দুঃসময়ের কর্মীদের বাদ দিয়ে সামনে আসছেন, আগামী দিনে দলের আবার দুঃসময় এলে তারা কি সেই কর্মীদের পাশে দাঁড়াবেন?”
রেডিসন ব্লুর ডেলিগেট কার্ড তাই আনোয়ারা বিএনপির তৃণমূলের কাছে এখন শুধু একটি প্রবেশপত্রের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে ত্যাগের মূল্যায়ন, রাজনৈতিক পরিচয়ের স্বচ্ছতা এবং দলীয় জবাবদিহির প্রতীক।
তৃণমূলের দাবি, কাউকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি নয়, বরং সত্য উদঘাটনই এখন সবচেয়ে জরুরি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কে কী ভূমিকা রেখেছেন, কে বিএনপির পাশে ছিলেন, কে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নিয়েছেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কে কীভাবে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন—এসব তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
কারণ তাদের মতে, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, ভবিষ্যতের দুঃসময়েও দলের মূল শক্তি তারাই। তাদের আস্থা হারিয়ে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।