মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উদ্যোগে মাদকবিরোধী সুধী সমাবেশ ও জনসচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। “মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সম্মিলিত অঙ্গীকার”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন সিভিক সেন্টারে এ সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা, আইনজীবী, শিক্ষক-শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় নেতা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। এতে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কোরআন মাজীদ তেলাওয়াত এবং পবিত্র গীতা, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়। এর মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও মাদকবিরোধী সামাজিক ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএম বলেন, মাদক কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি। মাদকের কারণে পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হচ্ছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ ও অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ফল পেতে হলে মাদকের চাহিদা কমানো এবং সামাজিকভাবে মাদককে প্রতিহত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের মাদক থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধান আলোচক চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেওয়ার সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলোও চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করতে হবে। তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথি ভূমি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এমপি বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও ক্রীড়ার সুযোগ সৃষ্টি। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সমাবেশ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। মাদক ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ সময় বক্তারা প্রত্যয় ব্যক্ত করেন—মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান হবে সম্মিলিত, প্রতিরোধ হবে সামাজিক এবং অভিযান হবে আইনানুগ ও ধারাবাহিক।
সুধী সমাবেশ শেষে মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। র্যালির মাধ্যমে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং মাদকমুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি জনসচেতনতা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। মাদকমুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।