চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও অলিগলিতে সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর। আগামী প্রজন্মকে মাদক ও সন্ত্রাসের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে এ কার্যক্রমকে ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ফটিকছড়িতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত মাদকবিরোধী র্যালি ও সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সরোয়ার আলমগীর বলেন, ‘আজ থেকে চট্টগ্রাম-২ নির্বাচনী এলাকার ফটিকছড়ি ও ফটিকছড়ি উত্তর—এই দুই উপজেলায় আমাদের সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী প্রচারণা চলবে। প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি ইউনিয়ন, প্রতিটি ওয়ার্ড ও প্রতিটি গলিতে এই জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, মাদক ও সন্ত্রাস কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের একক সমস্যা নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি পরিবারে একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে তার প্রভাব পুরো পরিবারে পড়ে। একইভাবে তরুণ ও যুবসমাজ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সমাজেও নানা ধরনের অপরাধ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তাই শুরু থেকেই তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে পরিবার থেকেই সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে এবং অবসর সময় কীভাবে কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেও পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সরোয়ার আলমগীর। তিনি বলেন, সন্তানের সচেতনতা, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণায় অনেক মাদকাসক্ত মানুষও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এজন্য মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু ঘৃণা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে তাকে মাদক ছেড়ে কর্মজীবনে ফেরার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পরিবারের কোনো সদস্য মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সন্তানদেরও সচেতন হতে হবে। বাবা মাদক সেবন করে বাড়ি ফিরলে সন্তানকে প্রশ্ন করতে হবে—‘বাবা, এই গন্ধ কিসের? কোথায় ছিলে, কী করেছ, টাকা কোথা থেকে পেলে?’ পরিবারের ভেতরে এ ধরনের জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাও নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাবেন।
অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মাগরিবের পর সন্তানরা যেন অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে বাবা-মাকে নজর রাখতে হবে। সন্তানদের বন্ধু কারা, তারা কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে পরিবারের নজরদারি ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ গঠনে মায়েদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন সরোয়ার আলমগীর। তিনি বলেন, ‘যে মা শিক্ষিত, যে মা সচেতন, সেই মা-ই একটি পরিবারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন।’ একজন সচেতন মা তার সন্তানকে সঠিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারেন। সেই সন্তান ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডারসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে শুক্রবার সকালে ফটিকছড়ির নাজিরহাট ঝংকার মোড় থেকে মাদকবিরোধী র্যালিটি শুরু হয়। র্যালিটি চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে বিবিরহাট বাজারের মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীমের সভাপতিত্বে মাদকবিরোধী সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
র্যালি ও সমাবেশে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।
আয়োজকরা জানান, মাদকবিরোধী সচেতনতা শুধু একটি দিনের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং ফটিকছড়িকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।