শিরোনাম
৪৮ বছরে বিএনপি: জিয়ার আদর্শ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর প্রত্যয়ে নাঙ্গলমোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযান: দেশীয় মদসহ দুই মাদক কারবারি আটক ‘কিছু ব্যবসায়ী কি ভোক্তাদের আদিম যুগে ফেরত নিতে চান?’—ক্যাব চট্টগ্রাম জিইসির আল-হেলাল হোটেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ৩ লাখ টাকা জরিমানা পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তি: যমুনা টিভির প্রতিবেদন ‘ভুল ব্যাখ্যাভিত্তিক’ দাবি রেলের সাতকানিয়ার ইউএনওর বিরুদ্ধে প্রচারণা: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি স্বার্থের সংঘাত? চট্টগ্রাম ওয়াসায় পিপিপি প্রকল্প উন্নয়ন বিষয়ক ৩ দিনব্যাপী বুটক্যাম্প শুরু ২,৭১২ কোটি টাকার এনসিটি যাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে, বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ করবে এপিএম টার্মিনালস: অর্থমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

২,৭১২ কোটি টাকার এনসিটি যাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে, বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

জাহাঙ্গীর আলম / ১৬১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক ও আধুনিক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। কোনো ধরনের বড় নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকারের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক লজিস্টিকস ও বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে টার্মিনালটির পরিচালন কর্তৃত্ব দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। একই সঙ্গে পাশের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে এনসিটি ও সিসিটিকে একটি সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাবও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি পৃথক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এনসিটির মূল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭৩৭ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালের ব্যাকআপ সুবিধা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বিপুল অর্থ ব্যয় করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটিতে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। অথচ বিপুল সরকারি অর্থে নির্মিত এবং বর্তমানে সচল ও লাভজনক এই টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এনসিটিতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রপাতিই আগে থেকে রয়েছে। সফটওয়্যার ও আইটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ ছাড়া এখানে নতুন করে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন বা সুযোগ খুব বেশি নেই। তবে পিপিপি কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইটে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ২০৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছে। এই অর্থ কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কী ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, তার সময় থেকেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটিকে অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। সে ক্ষেত্রে ডিপি ওয়ার্ল্ড সেবা দেওয়ার বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ পেত। কিন্তু পরবর্তীতে চুক্তির কাঠামো পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটিকে কনসেশনিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব আসে।

কনসেশন মডেলে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে টার্মিনাল ব্যবহারের বিপরীতে আদায় করা অর্থ প্রথমে কনসেশনিয়ারের হিসাবে জমা হবে এবং নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী বছর শেষে সেই আয়ের একটি অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে। মোহাম্মদ শাহজাহানের মতে, এতে বন্দর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ একটি কনটেইনার টার্মিনাল থেকে শুধু কনটেইনার ওঠানামা করেই আয় হয় না; স্টোরেজ, বিভিন্ন সেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম থেকেও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। কনসেশন চুক্তির আওতায় এসব আয়ের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত আর্থিক কাঠামো নিয়েও সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কমিটির মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ ফুটের একটি কনটেইনার থেকে গড় আয় কত হবে, তার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে রয়্যালটি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে গড় আয় ১০৫ ডলারের কম হলে ৪২ দশমিক ৫০ ডলার এবং গড় আয় ২১০ ডলার বা তার বেশি হলে ১৪১ দশমিক ৫০ ডলার রয়্যালটি দেওয়ার কথা রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন ট্যারিফ স্ল্যাবের ভিত্তিতে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল প্রস্তাব করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লালদিয়া ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের মতো অন্যান্য পিপিপি প্রকল্পে প্রতি টিইইউ কনটেইনারের বিপরীতে নির্দিষ্ট রাজস্বের কাঠামো বিবেচনা করা হয়েছে। অনুমোদিত আরএফপিতেও প্রতি টিইইউ নির্দিষ্ট রেভিনিউর শর্ত রাখা হয়েছে। ফলে এনসিটির ক্ষেত্রে নতুন করে পরিবর্তনশীল রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল কেন প্রস্তাব করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চলমান আর্থিক মডেল অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ কনটেইনারে পরিবর্তনশীল খরচ হয় ১৬ দশমিক ৩৯ ডলার। এর সঙ্গে স্থায়ী প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় রয়েছে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার। এই স্থায়ী ব্যয় অপরিবর্তনীয় এবং তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে বন্দরের গড় গ্রস আয় প্রায় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে কনটেইনার স্টোরেজ বা স্টোর রেন্ট থেকে, যার পরিমাণ প্রতি টিইইউতে প্রায় ৪০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত কাঠামোয় স্টোর রেন্টসহ বন্দরের বর্তমান রাজস্বের একটি অংশ বাদ গেলে কার্যকর আয় প্রতি টিইইউতে প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে। এই হিসাবে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে গ্রস রেভিনিউ ১২০ ডলার হলে প্রস্তাবিত কাঠামোয় বন্দর পাবে ৫৮ দশমিক ৫০ ডলার। এর মধ্য থেকে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার পরিচালন ব্যয় বহন করলে বন্দরের হাতে নিট মার্জিন থাকবে মাত্র ১৭ দশমিক ১৮ ডলার। অথচ বর্তমান আর্থিক মডেলে একই পরিমাণ আয় হলে পরিচালনা ও পরিবর্তনশীল ব্যয় বাদ দিয়েও বন্দরের মার্জিন প্রায় ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার বলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে।

এনসিটি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি বড় বিষয় হলো টার্মিনালের যন্ত্রপাতির বর্তমান অবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান সম্প্রতি বলেছেন, এনসিটির অপারেশনে ব্যবহৃত বেশিরভাগ যন্ত্রপাতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শেষ হওয়ার পথে। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সচল রয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা ৫০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এ সংকট মোকাবিলায় নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে এবং এতে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তবে সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার দাবি, এনসিটির প্রয়োজনীয় প্রায় সব ভারী যন্ত্রপাতি তার দায়িত্বকালে স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে টার্মিনালটিতে চারটি কুয়েসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি) ও চারটি রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরটিজি) যুক্ত করা হয়। গত কয়েক বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কিউজিসি ও ৩৩টি আরটিজিসহ আধুনিক সরঞ্জাম নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়েছে। টার্মিনালে অত্যাধুনিক টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমও সচল রয়েছে। এসব নতুন যন্ত্রপাতির বড় অংশের কার্যকর আয়ু এখনো অনেক বছর বাকি রয়েছে এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে আরও ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, এনসিটির জন্য নতুন করে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের যে প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি আকারের দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও অপারেশনাল দক্ষতায় এগিয়ে রয়েছে। জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) ছয়টি, এনসিটিতে চারটি, সিসিটিতে দুটি এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) তিনটি জেটি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয়টি জেটি নিয়ে জিসিবি ৪৬৫টি জাহাজ পরিচালনা করেছে। বিপরীতে চার জেটির এনসিটি পরিচালনা করেছে ৭৮১টি জাহাজ। একই সময়ে সিসিটিতে ২৩৮টি এবং পিসিটিতে ১২২টি জাহাজ এসেছে। গেল অর্থবছরে এনসিটি এককভাবে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। খাতা-কলমে টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউ হলেও ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি অর্থবছরেই সক্ষমতার বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে এনসিটি।

এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালের ১২ জুন পিপিপি প্ল্যাটফর্মের একটি বৈঠকে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে পিপিপি অফিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মুখ্য সচিব এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বিষয়টি মিটিং নোটসেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে এনসিটি ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যান্য টার্মিনাল বিদেশি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বর্তমানে এনসিটি নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনা করছে, যেখানে সাইফ পাওয়ারটেক সহযোগী হিসেবে রয়েছে। সিসিটি পরিচালনায় রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক এবং পিসিটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে। ফলে এনসিটিতেও আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর আনার মাধ্যমে বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ইতোমধ্যে লাভজনক ও আধুনিক একটি রাষ্ট্রীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রে বিদেশি কনসেশনিয়ার নিয়োগের ফলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বন্দর কার্যদক্ষতা সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬০-এর ঘরে থাকায় রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে অধিক সক্ষম ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার উদ্যোগ স্বাভাবিক বিষয়। তবে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো আলোচনা ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ, আর্থিক কাঠামো বা অপারেটর নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত জানাবে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে ফারহান লজিস্টিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা সম্প্রতি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাই এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই ছাড়া এনসিটির কর্তৃত্ব হস্তান্তরের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, চট্টগ্রাম। সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক জাহিদুল করিম কচি ও সদস্য সচিব ডা. খুরশীদ জামিল চৌধুরী বলেন, এনসিটির মূল অবকাঠামো নির্মাণে ৭৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরবর্তীতে ব্যাকআপ সুবিধা ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম কেনায়ও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটিতে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। একটি সচল ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদ অন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার আগে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার আহ্বান জানান তারা।

এনসিটি নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন শুধু টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাবে, তা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব, বিপুল সরকারি বিনিয়োগের সুরক্ষা, পরিচালন ব্যয়ের দায়, স্টোরেজ রেন্ট থেকে আয়, কনসেশন কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের হিসাব। একদিকে সরকার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে বন্দরসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, এনসিটিতে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামও রয়েছে। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে প্রস্তাবিত ২০৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কোন খাতে হবে, কনসেশনের মেয়াদ কত, রাজস্ব ভাগাভাগির সূত্র কী, স্টোরেজ রেন্টের আয় কার হাতে যাবে এবং পরিচালন ব্যয়ের দায় কে বহন করবে—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ