শিরোনাম
ভাসমান গুদাম ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে চট্টগ্রাম বন্দরে কঠোর নজরদারি বিশ্বমানের উইকেট তৈরিতে চট্টগ্রামে বিসিবির বিশেষ প্রশিক্ষণ ঐক্যবদ্ধ টিভি সাংবাদিকদের নিয়ে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ফোরাম গঠন সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল কণ্ঠ অনুকরণ থেকে ভয়েসওভার, নৃত্যে পুরস্কার—জয়িতা রশীদের গল্প পরিচয়-প্রভাব নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই ব্যবসার সুযোগ: আমির খসরু চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুন্না, সদস্য সচিব মানিক সাতকানিয়ায় এসএসসির ফলে শীর্ষে বায়তুল ইজ্জত বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল বন্যাদুর্গতদের পাশে চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল, ভূমি প্রতিমন্ত্রীর কাছে চেক হস্তান্তর শিল্পী হওয়াই আমার লক্ষ্য, আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নও আছে: আতিকা আফসানা
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন

কণ্ঠ অনুকরণ থেকে ভয়েসওভার, নৃত্যে পুরস্কার—জয়িতা রশীদের গল্প

হৃদয় খান / ৪০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

নাচ ও কণ্ঠশিল্প—শিল্পের দুটি ভিন্ন মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন জয়িতা রশীদ। ছোটবেলা থেকেই নৃত্যচর্চার পাশাপাশি কণ্ঠ অনুকরণের সহজাত দক্ষতা তাকে ধীরে ধীরে পরিচিত করে তুলেছে ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে। নৃত্যের মঞ্চে শরীরী অভিব্যক্তি আর ভয়েসওভারে কণ্ঠের অভিনয়—দুই মাধ্যমেই সৃজনশীলতার নিজস্ব প্রকাশ ঘটাচ্ছেন তিনি।

খুলনায় গ্রামের বাড়ি হলেও ঢাকায় বেড়ে ওঠা জয়িতা সম্প্রতি নৃত্যে পেয়েছেন ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’। দীর্ঘ প্রায় চার বছর পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হওয়ায় এই স্বীকৃতি তার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়, প্রতিযোগিতার আগের রাতেই অংশ নেওয়ার খবর পান তিনি এবং কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

জয়িতা বলেন, দীর্ঘদিনের নৃত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই সম্মাননা তার জন্য আনন্দ ও গর্বের। কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই প্রতিযোগিতায় গিয়ে প্রথম হওয়ায় পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতিটা ছিল আরও বেশি আনন্দের।

মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে জয়িতার নাচ শেখার শুরু। তার নৃত্যজীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মায়ের। তিনিই ছিকলেন তার প্রথম নৃত্যশিক্ষক এবং ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে নাচের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেষ্টা করেছেন। যদিও শৈশবে নাচের প্রতি জয়িতার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। নৃত্যগুরুকে ভয় পেতেন, ক্লাসে যেতে চাইতেন না, এমনকি কান্নাও করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই ভয় ও অনীহা বদলে গিয়ে নাচের সঙ্গে গড়ে ওঠে গভীর ভালোবাসা।

জয়িতার কাছে নৃত্য শুধু একটি শিল্প নয়, বরং নিজেকে প্রকাশের মাধ্যম। মঞ্চে নাচার সময় শরীরের মুভমেন্ট, মুখের অভিব্যক্তি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই কণ্ঠ অনুকরণের প্রতিও ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ অনুকরণ করে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের শোনানো ছিল শৈশবের অন্যতম আনন্দ। মায়ের উৎসাহেই সেই শখ পরবর্তীতে পেশাগত পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

২০২০ সালে করোনাকালে অনলাইনভিত্তিক একটি প্রতিযোগিতা তার জীবনে নতুন সুযোগ তৈরি করে। সেখানে বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠ অনুকরণ করতে দেখে জয়িতা লক্ষ্য করেন, কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নিয়ে খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। ছোটবেলার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে তিনিও অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের উৎসাহে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি করেন প্রথম ভিডিও। প্রথম ভিডিওতেই ভালো সাড়া পাওয়ার পর একের পর এক কাজ করতে থাকেন। এভাবেই শখ থেকে ধীরে ধীরে ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে পেশাগত পরিচয় তৈরি হয় তার।

জয়িতার মতে, ভয়েসওভারের জন্য শুধু সুন্দর কণ্ঠস্বর থাকলেই হয় না; প্রয়োজন অভিনয়, আবেগ ও এক্সপ্রেশন প্রকাশের দক্ষতা। তার ভাষায়, ভয়েসওভার মানে শুধু কণ্ঠ দিয়ে কথা বলা নয়, বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করা।

ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের টোন, পিচ ও ভঙ্গি পরিবর্তনের দক্ষতার পেছনে রয়েছে তার সংগীতচর্চাও। নাচের পাশাপাশি সুজিত মোস্তফার কাছে গান শিখেছেন জয়িতা। নিয়মিত রেওয়াজের মাধ্যমে বিভিন্ন ভোকাল রেঞ্জে কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের যে অনুশীলন করেছেন, তা পরবর্তীতে ভয়েসওভারের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে ভয়েসওভারের পথচলা পুরোপুরি সহজ ছিল না। সঠিক উচ্চারণ, আবেগ, এক্সপ্রেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন তিনি। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় বাংলা উচ্চারণে বাড়তি অনুশীলন করতে হয়েছে। নতুন কোনো স্ক্রিপ্ট হাতে এলে প্রথমে কঠিন শব্দগুলোর উচ্চারণ ঠিক করেন, এরপর কোথায় বিরতি, কোন শব্দে কতটা জোর এবং কী ধরনের আবেগ প্রয়োজন—সেগুলো নির্ধারণ করে কাজ করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কণ্ঠ তৈরি ও অনুকরণের প্রসঙ্গেও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে জয়িতার। তার মতে, প্রযুক্তি মানুষের কণ্ঠকে অনুকরণ করতে পারলেও চরিত্রের পরিস্থিতি ও অনুভূতি বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে অভিনয় করে প্রকাশ করার জায়গায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগ এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

নাচ ও ভয়েসওভারকে আলাদা দুটি মাধ্যম হিসেবে দেখলেও দুটির মধ্যে একটি মৌলিক মিল খুঁজে পান জয়িতা। তার ভাষায়, “আমি যখন নাচি, তখন আমার শরীর কথা বলে; আর যখন ভয়েসওভার করি, তখন আমার কণ্ঠ কথা বলে।” নাচে শরীর ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে, আর ভয়েসওভারে কণ্ঠের ওঠানামা ও আবেগের মাধ্যমে মানুষের কাছে অনুভূতি পৌঁছে দেন তিনি।

পড়াশোনা ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও নৃত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন জয়িতা। দীর্ঘ সময় না পেলেও অল্প অবসরকে কাজে লাগিয়ে নাচের অনুশীলন কিংবা ডান্স ভিডিও তৈরি করেন। তার বিশ্বাস, নিয়মিত চর্চা ধরে রাখতে সবসময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই; ছোট ছোট সময়ও সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করা যায়।

নৃত্য প্রতিযোগিতার সঙ্গেও তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পেয়েছেন। তবে প্রায় চার বছর আগে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। তার নৃত্যগুরুর একটি কথা তাকে নতুনদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার কথা ভাবতে শেখায়। ফলে প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে দূরে থাকলেও নৃত্যের চর্চা থামাননি।

এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাও ছিল অনেকটা আকস্মিক। এক সিনিয়রের অনুরোধে প্রতিযোগিতার শেষ দিনে সেখানে যান তিনি। শেষ ডান্স সেগমেন্টে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রথম হন। অর্জন করেন ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’।

এই পুরস্কার জয়িতাকে ফিরিয়ে নেয় শৈশবের সেই দিনগুলোতে, যখন প্রতিযোগিতায় প্রথম না হলে মন খারাপ হতো। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও প্রতিযোগিতার মঞ্চে উঠে প্রথম হওয়া তার কাছে প্রমাণ করেছে—নাচের প্রতি ভালোবাসা ও টান এখনও আগের মতোই রয়েছে।

জয়িতার স্বপ্নও বড়। কোনো একটি কার্টুন চরিত্রের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি এমন একটি নিজস্ব কণ্ঠ বা চরিত্র তৈরি করতে চান, যা ভবিষ্যতে অন্য শিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। ছোটবেলায় যেমন অন্যদের কণ্ঠ অনুকরণ করে আনন্দ পেয়েছেন, তেমনি একদিন তার কণ্ঠও যেন অন্য কারও অনুপ্রেরণার কারণ হয়—এটাই তার প্রত্যাশা।

নৃত্যের মঞ্চে শরীরী অভিব্যক্তি আর ভয়েসওভারে কণ্ঠের অভিনয়—দুটি ভিন্ন মাধ্যমে পথচলা হলেও জয়িতার লক্ষ্য একটাই, নিজের সৃজনশীলতা ও অনুভূতিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রতিভা, অধ্যবসায় ও মায়ের অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করে শিল্পের জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে এগিয়ে যাচ্ছেন জয়িতা রশীদ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ