বাংলার মাটিতে এমন এক মানুষ আছেন, যিনি সূর্য ওঠার আগেই লাঙল কাঁধে মাঠে নামেন। দিনভর রোদ, ঘাম আর পরিশ্রমে তিনি ফলান আমাদের অন্ন। সন্ধ্যা নামলে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরেন, তবু পরের দিনের চিন্তা মাথা ছাড়ে না। তিনি এই দেশের শক্তি, আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি। অথচ বছরের পর বছর সেই মানুষটিই থেকেছেন সুযোগ-সুবিধার বাইরে। ভর্তুকির অর্থ ঠিকমতো পৌঁছায়নি তাঁর হাতে, প্রয়োজনের সময় পাননি সহজ ঋণ, বীজ কিনতে গিয়েও হয়েছেন প্রতারিত। এই দীর্ঘ অবহেলা ও বঞ্চনার চক্র ভাঙতেই এবার নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে একটি পরিচয় ও অধিকারের প্রতীক, যার নাম ‘কৃষক কার্ড’।
পহেলা বৈশাখের দিনে টাঙ্গাইলে এই কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন ২২ হাজারের মতো কৃষকের হাতে পৌঁছে গেছে তাঁর এই পরিচয়ের স্বীকৃতি। আগামী চার বছরে দেশের এক কোটি পঁয়ষট্টি লাখ কৃষক পরিবারের কাছে এই স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু ধান-পাট চাষির কথা ভাবা হয়নি, মৎস্যচাষি এবং দুগ্ধ খামারিরাও এই কার্ডের আওতায় আসবেন। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা।
এই কার্ড আসলে কী দেবে কৃষককে? প্রশ্নটা স্বাভাবিক, কারণ কাগজে-কলমে অনেক প্রতিশ্রুতি আগেও দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, একটি কার্ডের মাধ্যমেই কৃষক পাবেন দশটি বিশেষ সুবিধা। ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পাওয়া যাবে। সরকারি ভর্তুকি সরাসরি পৌঁছাবে কৃষকের নিজের ব্যাংক হিসাবে। সেচের খরচ কমবে, সহজ শর্তে মিলবে কৃষিঋণ, থাকবে শস্যবিমার সুবিধাও। এর বাইরে ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রির সুযোগ, আধুনিক চাষপদ্ধতির প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার আগাম তথ্য এবং রোগবালাই দমনে বিশেষজ্ঞ পরামর্শও মিলবে এই একটি কার্ডের আওতায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিটি কার্ডধারী কৃষকের জন্য সোনালী ব্যাংকে আলাদা একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হবে, যা পুরো ব্যবস্থাটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ করে তুলবে। সরকারি ভর্তুকির অর্থ সরাসরি সেই হিসাবে জমা হবে, ফলে মাঝখানের অপ্রয়োজনীয় হাতবদলের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে এবং দীর্ঘদিনের মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতার চক্র ভাঙার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে শুধু স্বচ্ছতাই বাড়বে না, কৃষকও তার প্রাপ্য সুবিধা সময়মতো ও নির্ভরযোগ্যভাবে হাতে পাবেন। পাশাপাশি প্রতিটি কার্ডে কৃষকের পঁয়তাল্লিশ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যা একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এই ডেটাবেজ ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ, সেবা সম্প্রসারণ এবং কৃষিখাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করার সিদ্ধান্তটিও বেশ চিন্তাশীল পদক্ষেপ। পাঁচ শতাংশের কম জমির মালিক হলে ভূমিহীন, পাঁচ থেকে উনপঞ্চাশ শতাংশ হলে প্রান্তিক, পঞ্চাশ থেকে দুইশো উনপঞ্চাশ শতাংশ হলে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এর বাইরে থাকবেন মাঝারি ও সচ্ছল কৃষক। ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা গড়ে আড়াই হাজার টাকা করে ভর্তুকি বা কৃষি উপকরণ সহায়তা পাবেন।
পাইলট পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের নয়টি উপজেলার নয়টি ব্লকে কার্ড বিতরণ করা হবে। উপজেলাগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, যা ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়ার একটি ইতিবাচক দিক। প্রাক-পাইলট পর্যায়ে আগামী পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে সব শ্রেণির কৃষকের তথ্য সংগ্রহ শেষ হবে।
তবে এতটুকু পড়ে যদি কেউ ভাবেন, এটি নিখুঁত একটি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই, তাহলে কিছুটা থামা দরকার। একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, উদ্যোগটি যত প্রশংসনীয়, চ্যালেঞ্জগুলো তত কম নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা কতটা নিখুঁতভাবে হবে? দেশে অনেক জায়গায় কৃষকের হালনাগাদ তালিকা নেই, তদারকির অভাবে অ-কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ন্যায্যমূল্যে সার বা অন্যান্য উপকরণ বিতরণের সময় স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা বিরল নয়। শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেই চলবে না, মাঠ পর্যায়ে সৎ তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, ডেটাবেজ কতটা নির্ভরযোগ্য হবে? পঁয়তাল্লিশ ধরনের তথ্য সংগ্রহ মানে বিশাল এক তথ্য-সম্ভার পরিচালনা করা। এই ডেটা নিয়মিত আপডেট করা না হলে এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে পুরো ব্যবস্থাটি সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয় প্রশ্নটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: এই কার্ড কি সত্যিই কৃষকের জীবনমান বদলাবে? উত্তর হলো, কার্ড একা কিছু করে না। কার্ড হলো একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমের পেছনে যদি স্বচ্ছ নীতি, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সুদৃঢ় ভিত না থাকে, তাহলে সেরা পরিকল্পনাও মাঠে মার খায়। তবে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা গেলে এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ সত্যিই মাইলফলক হতে পারে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে সরকার। মোট মওকুফকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যার সুফল পাচ্ছেন অন্তত বারো লাখ কৃষক। এই প্রেক্ষাপটে কৃষক কার্ডকে আলাদা কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি কৃষিখাতে চলমান বৃহত্তর সংস্কার প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
একটু ভেবে দেখলে প্রশ্ন আসে, এই কৃষক কার্ডের আসল তাৎপর্য কোথায়। এটি শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়, এর ভেতরে আছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃষকের প্রতি স্বীকৃতির বার্তা। যেন বলা হচ্ছে, দেশের খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে আছেন, তাঁদের সরকার জানে, চেনে এবং তাঁদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। এই স্বীকৃতি কেবল প্রশাসনিক নয়, এর একটি গভীর মানসিক দিকও রয়েছে, যা কৃষকের আত্মবিশ্বাস ও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, উদ্যোগে সদিচ্ছা রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাঠামোও তৈরি হয়েছে, অর্থ বরাদ্দও নিশ্চিত করা হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ সত্যিই ফলপ্রসূ হতে পারে। তখন কৃষকের হাতে শুধু একটি কার্ডই থাকবে না, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হবে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত, যার সুফল শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে পুরো দেশের অর্থনীতি ও সমাজে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।