শিরোনাম
বাঁশখালীর বন্যায় মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত এসিল্যান্ড ওমর সানী বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু চট্টগ্রামে বন্যাকবলিত মানুষের খোঁজে রিজভী ও প্রতিমন্ত্রী, ত্রাণ পেল ১,৫০০ পরিবার ছয় দিনের প্রচারণায় জয়, সংসদে সরোয়ার আলমগীর স্বচ্ছতা ও মানবসেবায় মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের ১৩ বছরের অর্জন চট্টগ্রামে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় এনজিও সংস্থা “আইএসএসডি”এর পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা চলমান সাবেক প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম চৌধুরী আর নেই চেন্নাইগামী ইউএস-বাংলা ফ্লাইটে দীর্ঘ বিলম্ব ও এসি বিভ্রাট, গরমে অতিষ্ঠ রোগী-শিশুসহ যাত্রীরা বন্যা কমেছে, স্বস্তি নয়—সাতকানিয়ায় শুরু নতুন সংকট পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়ান
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

বাঁশখালীর বন্যায় মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত এসিল্যান্ড ওমর সানী

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: / ৫৭ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওমর সানী আকন তাঁর নিরলস মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। সরকারি দায়িত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে দিন-রাত মাঠে থেকে উদ্ধার, ত্রাণ, পানিনিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তিনি এখন বাঁশখালীবাসীর কাছে এক অনন্য উদাহরণ।

সম্প্রতি এক রাতে ঘড়িতে তখন প্রায় রাত ১০টা। ছনুয়া ইউনিয়ন থেকে খবর আসে, এক ব্যক্তি স্লুইসগেটে জাল বসিয়ে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অফিস থেকেই ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওমর সানী আকন। উল্লেখ্য, তিনি সারাদিন মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় না গিয়ে অফিসেই অবস্থান করছিলেন।

ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে গেলেও প্রশাসনের উপস্থিতিতে স্লুইসগেটে বসানো জাল খুলে তা পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা ও স্ত্রীর মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং পরদিন অফিসে এসে মুচলেকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে কাদামাটির দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে আরও তিনটি স্থানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেও পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা জাল জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

অভিযান শেষে স্থানীয়রা তাঁকে প্রায় ১০ মিনিট কাদামাটির পথ পাড়ি দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাড়ি দেখাতে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আবাখালী এলাকার বাসিন্দা হাসিনা বেগম-এর ঘর সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এই নারী বর্তমানে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত। তাঁর স্বামী ক্যানসারে মারা গেছেন এবং তাঁর কোনো ছেলে সন্তানও নেই।

মানবিক বিবেচনায় এসিল্যান্ড ওমর সানী আকন তাঁর জন্য এক বান টিনের ব্যবস্থা করেন। শুধু হাসিনা বেগমই নন, আরও দুটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্যও একইভাবে টিনের ব্যবস্থা করেন তিনি। জানা যায়, এসব সহায়তা সরকারি বরাদ্দ থেকে নয়; বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় সংগ্রহ করা হয়েছে।

একই রাতে স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, মাছের ঘের তৈরির কারণে পানি নামতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে স্কেভেটর এনে বাঁধ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে গভীর রাতে স্কেভেটর না পাওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি নিজ উপস্থিতিতে পরদিন সকাল ৭টায় কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সব কার্যক্রম শেষে রাত ১২টা ২০ মিনিটে ছনুয়া ত্যাগ করে প্রায় রাত ১টার দিকে উপজেলা বাসভবনে ফেরেন তিনি।

সেদিন ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে গাড়িতেই এক বন্ধুর ফোন পান এসিল্যান্ড। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “বাঁশখালী বন্যায় ডুবে গেছে।” অপর প্রান্ত থেকে বন্ধুর হাসির প্রতিক্রিয়া শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, “তুই হাসছিস কেন? এটা কি হাসার বিষয়? যেহেতু ফোন করেছিস, অন্তত একটি পরিবারের দায়িত্ব নে। ৫ হাজার ৮০০ টাকা দিলে এক বান টিনের ব্যবস্থা করা যাবে। আমি নিজে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে পৌঁছে দেব।”

এ ঘটনায় তাঁর মানবিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁশখালীর সন্তান না হয়েও তিনি যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

এর আগেও ছনুয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ত্রাণ টিম পরিদর্শনে এলে সাংবাদিকদের সঙ্গে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসেই এক ইউপি চেয়ারম্যানকে ফোন করে তিনি জানতে চান, আগত টিমের সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না। চেয়ারম্যান আগের দিনের তথ্য জানালে তিনি নিজের অর্থায়নে আরও একবেলার খাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন।

একই সফরে তাঁর গাড়িতে থাকা কলা দেখে জানতে চাইলে তিনি জানান, এগুলো তাঁর বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে দুর্গত মানুষদের দেওয়া যায়। ব্যক্তিগত খাদ্যসামগ্রীও তিনি বন্যার্তদের জন্য ব্যবহার করেছেন।

কয়েকদিন আগে বাহারছড়া ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দেখা যায়, এসিল্যান্ড ওমর সানী আকন নিজেই কাদামাটিতে নেমে ত্রাণগ্রহীতাদের সারিবদ্ধ করছেন। সাধারণত এ ধরনের কাজ পুলিশ বা গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও তিনি কোনো ধরনের সংকোচ না করে নিজেই দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে গত ৫ জুলাই তাঁর বদলির আদেশ জারি হলেও ৭ বা ৮ জুলাইয়ের মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বাঁশখালী ছাড়েননি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রিলিজে কোনো আপত্তি ছিল না। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “বাঁশখালীর মানুষ এই দুর্যোগে আছে, তাদের এই অবস্থায় রেখে আমি চলে যেতে পারি না।”

প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। অনেক সহায়তার বিষয় প্রকাশও করেননি। কাদা, পানি কিংবা দুর্গম এলাকা—যেখানেই প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই নিজে উপস্থিত থেকেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যে মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ও আত্মনিবেদন তিনি দেখিয়েছেন, তা একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বদলিজনিত কারণে তাঁকে হারানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাঁশখালীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে হতাশা ও আবেগের সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের প্রত্যাশা, এমন মানবিক ও জনবান্ধব কর্মকর্তার কর্মস্পৃহা ভবিষ্যতেও অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ