প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি। চট্টগ্রামের উপকূলীয় জনপদ আজ যেন এক নীরব আর্তনাদের নাম। আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও হাঁটুসমান পানি। কয়েক লাখ পরিবার ঘরবন্দি, কর্মহীন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
যাদের দিন চলে দিনমজুরির আয়ে, তাদের চুলায় আগুন জ্বলছে না। যারা মাছ ধরে, ক্ষেতে কাজ করে কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালান, তারা আজ আয়হীন। শিশুরা শুকনো খাবারের অপেক্ষায়, বয়স্করা প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। গর্ভবতী নারী, অসুস্থ মানুষ এবং প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। অন্যদিকে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাঠ-ঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঘাস সংগ্রহের সুযোগ নেই। ফলে মানুষ যেমন খাদ্যসংকটে, তেমনি গবাদিপশুও বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
এমন সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত আমরা মানুষ। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থান।এসবের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার পরিচয় দেওয়ার এখনই সময়। কারণ দুর্যোগ কাউকে আলাদা করে আঘাত করে না।এটি ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবার জীবনকেই স্পর্শ করে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ।
চট্টগ্রামের ইতিহাস মানবিকতার ইতিহাস। যেকোনো দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনায় এ অঞ্চলের মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই ঐতিহ্য আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাই যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা নিয়েই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। এক প্যাকেট শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানির কয়েকটি বোতল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শিশুখাদ্য বা গবাদিপশুর জন্য কিছু খাদ্য এসব ছোট ছোট সহযোগিতাই অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে।
একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং বিত্তবানদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু ছবি তোলা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রকৃত সহায়তা যেন দ্রুত পানিবন্দি মানুষের কাছে পৌঁছে সেদিকে নজর দিতে হবে। কারণ দুর্যোগের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আশ্বাস নয়, কার্যকর সহযোগিতা।
প্রকৃতির এই কঠিন সময়ে আমরা যদি একজন মানুষেরও পাশে দাঁড়াতে পারি, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় মানবিক অর্জন। আসুন, অপেক্ষা না করে আজই যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। মনে রাখি, দুর্যোগ একদিন কেটে যাবে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সহমর্মিতার গল্পই ইতিহাসে বেঁচে থাকবে।