দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে আগামী ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা অচিরেই জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়ায় পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী ও নতুন টিনের ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাহারছড়ায় সমবেত হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে সমাবেশটি পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে ও তাঁর বক্তব্য শুনতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। সমাবেশস্থলে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বাঁশখালীর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী সফরকে স্বাগত জানিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

পাপ্পা বলেন, বাঁশখালী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ একটি জনপদ। বিশেষ করে বাহারছড়ার বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তাই বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বাহারছড়াকে গড়ে তুলতে পারলে শুধু পর্যটকদের আগমনই বাড়বে না, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। এতে বাঁশখালীর মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
সাম্প্রতিক বন্যায় বাঁশখালীর ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, বন্যায় অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০০টি নতুন টিনের ঘর উপহার দেওয়ার উদ্যোগ বাঁশখালীর মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছে।
বাঁশখালীর উপকূলীয় মানুষের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রতিবছর বর্ষা, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন উল্লেখ করে স্থায়ীভাবে উপকূল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। পাশাপাশি কৃষক, লবণচাষি, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পাপ্পা বলেন, বাঁশখালীর উন্নয়নকে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, উপকূল রক্ষা, পর্যটন বিকাশ, লবণশিল্প ও কৃষির উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাঁশখালীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, বাঁশখালীর মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরাসরি এলাকায় আসায় বাঁশখালীবাসী কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বাঁশখালীর উন্নয়নে ভবিষ্যতেও সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
পরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে। জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ খাতকে নতুনভাবে পরিকল্পনার আওতায় আনতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হলেও সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সামনে আগামী ১০ বছরে আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনা কী হবে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কী হবে—সেই প্রস্তাবনা আমরা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব। আমরা পরিকল্পনা দিয়ে সেই কাজ শুরু করব।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা ও বাসাবাড়িতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যাসের চাহিদা পূরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারও বিকল্প পরিকল্পনা থাকলে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। তবে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি বা জনগণের শান্তি নষ্ট করা যাবে না।
তিনি বলেন, এখন দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সময়, দেশ গঠনের সময়। পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশের পরে স্বাধীন হয়েও পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকতে পারে না। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের ভাগ্যের পরিবর্তনই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বিএনপি সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে জনগণের সহযোগিতা কামনা করে তারেক রহমান বলেন, জনগণই বিএনপির সব ক্ষমতার উৎস। জনগণের সমর্থন থাকলে জনগণের স্বার্থে নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক মানুষকে দেশ গঠনে সম্পৃক্ত করতে হবে। মানুষ যেন নিজের শ্রমের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে, সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প-কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।
দেশে শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। দোকানপাট বন্ধ থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ চান।
শিল্প-কারখানার উৎপাদিত পণ্য যাতে নির্বিঘ্নে বন্দরে নেওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যাতে যথাসময়ে আনা যায়, সে জন্য রাস্তাঘাটে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিল-কারখানা সঠিকভাবে না চললে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। যারা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্যও দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্কুল-কলেজ নির্মাণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভ্রান্তকারীরা সুযোগ পেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। এখন দেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হবে, নাকি ঝগড়া-বিবাদ ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে থাকা হবে।
বিগত স্বৈরাচার আমলে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত কয়েকজন ব্যক্তির স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই সময় দেশের মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে গুটিকয়েক ব্যক্তির স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে নতুনভাবে পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
সমাবেশে বাঁশখালীর বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লবণের মূল্য নির্ধারণসহ স্থানীয়দের বিভিন্ন দাবির প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে হেলিকপ্টারে করে বাঁশখালীর বাহারছড়ায় পৌঁছান তিনি। সেখানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে ত্রাণসামগ্রী ও নতুন টিনের ঘরের চাবি তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাহারছড়া এলাকায় কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয়। স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন দাবি, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি, পুনর্বাসন এবং বাঁশখালীর পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়গুলো এ সময় গুরুত্ব পায়।
সমাবেশে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।এভাবে প্রতিবেদনটি একটানা জাতীয়/আঞ্চলিক দৈনিকের নিউজ রিপোর্টের কাঠামোয় রাখা হয়েছে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পাশাপাশি পাপ্পার বক্তব্যও স্বাভাবিক সংবাদ-ধারায় এসেছে।