বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাকে ঘিরে চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সভায় অংশ নেওয়া ডেলিগেটদের পরিচয়, তাদের রাজনৈতিক অতীত এবং কারা তাদের ডেলিগেট কার্ড দিয়েছেন—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট ও মন্তব্যে প্রশ্ন তুলছেন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।
তৃণমূলের অভিযোগ, গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন, তাদের অনেকেই ৯ আগস্টের ওই মতবিনিময় সভায় প্রবেশের সুযোগ পাননি। অথচ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে—এমন কয়েকজন ব্যক্তি কীভাবে ডেলিগেট হিসেবে সভায় প্রবেশের সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন—‘রেডিসন ব্লুর ৭০০ ডেলিগেট কারা?’
তাদের দাবি, সভায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক ডেলিগেটের নাম, পদবি, সাংগঠনিক পরিচয় এবং কোন ইউনিটের সুপারিশে তারা কার্ড পেয়েছেন—তা প্রকাশ করা হোক।
চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান ক্ষোভের পেছনে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহও সামনে আনছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক এবং নাজিমুর রহমানকে সদস্যসচিব করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছিল। এর কয়েকদিনের মধ্যেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। পরে আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
অর্থাৎ আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাত্র ২৯ দিনের মাথায় দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
তৃণমূলের একাংশের প্রশ্ন, মাত্র ২৯ দিন আগে গঠিত নেতৃত্ব কীভাবে গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস, কে কোথায় হামলার শিকার হয়েছেন, কার বিরুদ্ধে কত মামলা হয়েছে, কে কারাগারে ছিলেন এবং কারা নিয়মিত রাজপথে ছিলেন—এসবের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করবে?
তাদের ভাষায়, দুঃসময়ের রাজনীতির সঙ্গে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কম, তাদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে দলের সঙ্গে থাকা ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করা কঠিন।
চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূলের এই ক্ষোভের সঙ্গে সাবেক মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। নেতা-কর্মীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে তাদের নেতৃত্বে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা-মামলা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
২০২৪ সালের ৩ ও ৪ আগস্টের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ তুলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দাবি করছেন, ওই সময় ডা. শাহাদাত হোসেনের বাসায় হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আবুল হাশেম বক্করের বাসায়ও হামলার অভিযোগ রয়েছে। বক্করের শারীরিকভাবে গুরুতর আহত হওয়ার বিষয়টিও নেতা-কর্মীরা উল্লেখ করছেন। তাদের বক্তব্য, যারা রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় এমন ঝুঁকি নিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তাদের মূল্যায়ন কতটা হয়েছে, সেটিও এখন বিবেচনার দাবি রাখে।
রেডিসন ব্লুর মতবিনিময় সভার দিন হোটেলের বাইরে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি এবং ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে উঠে এসেছে। অনেক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আশায় এসেও ডেলিগেট কার্ড না থাকায় অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারেননি।
অন্যদিকে সভা চলাকালে ভেতর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর নতুন করে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কয়েকটি ছবিতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে অতীতে ছবি রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের দেখা গেছে বলে দাবি করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পোস্ট দেন। এসব ছবি দেখিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা কীভাবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ডেলিগেট হওয়ার সুযোগ পেলেন।
জাহিদুল ইসলাম নামের এক ছাত্রদল কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দলের দুঃসময়ে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নেওয়া নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—দলের দুঃসময়ের সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিতর্কিত ব্যক্তিরা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পেলেন, সেটি তদন্ত করা প্রয়োজন।
খলিলুর রহমান নামের আরেক ব্যক্তি চট্টগ্রামের সাংগঠনিক সভায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, তাদের সাংগঠনিক পরিচয় কী এবং কোন প্রক্রিয়ায় তারা ডেলিগেট কার্ড পেয়েছেন।
আহমেদ সেহতাব নামের একজনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের ছবি ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন। যুবদলের নেতা জলিল একটি ব্যক্তির রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পোস্ট দেন। মাইনউদ্দিন খান রাজীব নামের এক যুবদল কর্মীও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তির ডেলিগেট কার্ড পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জুনাইদ শাকিবের পোস্টে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের হতাশা। তার বক্তব্যের সারকথা—১৭ বছর ধরে যারা দলের জন্য কষ্ট করেছেন, তাদের অনেকেই একটি কার্ডও পেলেন না; অথচ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিরা বিএনপির অনুষ্ঠানে জায়গা পাচ্ছেন। এতে একসময় ত্যাগী নেতা-কর্মীরা বিএনপির জন্য রাজনীতি করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
পটিয়া উপজেলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আলী সিকদার নামের একজন। তার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিরা কীভাবে রেডিসন ব্লুর অনুষ্ঠানে ডেলিগেট হলেন এবং তাদের বিএনপির সাংগঠনিক পদ কী। একই সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও জানতে চান তিনি।
পান ইদ্রিস ওরফে সান্ড্রা মিয়া ইদ্রিস নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তারেক রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামের মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের ‘দোসররা’ কীভাবে কার্ড পেলেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০০ ডেলিগেটের নাম ও পদবি প্রকাশের দাবি জানান।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার ছবি থাকা মানেই তিনি আওয়ামী লীগের নেতা বা সহযোগী ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি টানা যায় না। ছবির সময়কাল, প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তৎকালীন রাজনৈতিক পরিচয় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও দলীয় নথি পর্যালোচনা জরুরি।
তীব্র ক্ষোভের মধ্যেও রেডিসন ব্লুর অনুষ্ঠানকে ঘিরে একটি মানবিক ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে চোখ হারানো এক কর্মীকে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিতে যুবদল নেতা মোশারফ হোসেইন নিজের ডেলিগেট কার্ড ওই কর্মীর হাতে তুলে দেন। ঘটনাটি ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, আন্দোলনে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বিএনপির তৃণমূলের ক্ষোভ এখন শুধু একটি অনুষ্ঠানে কে ঢুকেছেন আর কে ঢুকতে পারেননি—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক ত্যাগের মূল্যায়ন, দলের সাংগঠনিক স্বচ্ছতা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কারা বিএনপির নেতৃত্বের কাছাকাছি আসছেন—সেই প্রশ্ন।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন দলের বাইরে থাকা কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন—এমন কেউ কেউ এখন বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এ অভিযোগের সার্বিক সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে সবচেয়ে জোরালো দাবি উঠেছে রেডিসন ব্লুর মতবিনিময় সভার ডেলিগেট তালিকা প্রকাশের। তাদের দাবি, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের নাম, পদবি, সাংগঠনিক ইউনিট এবং মনোনয়নের প্রক্রিয়া প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে দলীয়ভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ দেওয়া হোক।
কারণ বিএনপির তৃণমূলের কাছে একটি ডেলিগেট কার্ড শুধু অনুষ্ঠানে প্রবেশের অনুমতিপত্র নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগের স্বীকৃতি ও দলের কাছে নিজের অবস্থানের একটি প্রতীক।
তাই রেডিসন ব্লুর মতবিনিময় সভাকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের উত্তর শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্টের মাধ্যমে নয়, দলীয়ভাবে স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।
তাদের মূল প্রশ্ন একটাই—১৭ বছর যারা দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন কোথায়? আর রেডিসন ব্লুর মতবিনিময় সভার ডেলিগেট তালিকায় কারা ছিলেন, কীভাবে তারা নির্বাচিত হলেন এবং কারা তাদের কার্ড দিলেন?