চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, সড়কসহ বিভিন্ন স্থাপনা। উপজেলার চরতী ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে অনেক কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে মসজিদ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য বসতবাড়ি। দ্রুত জিও ব্যাগ ও পাথরের ব্লক দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চরতী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীপাড়া এলাকায় নদীভাঙনে ইতোমধ্যে নদীর পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ কৃষিজমি বিলীন হয়ে গেছে। নদীর কিনার ঘেঁষে থাকা অসংখ্য বসতবাড়িও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে আরও বহু পরিবার তাদের বসতভিটা হারাতে পারে।
অন্যদিকে, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর ও দক্ষিণ ব্রাহ্মণডেঙ্গার মধ্যবর্তী প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় নদীর তীরে পাথরের ব্লক না থাকায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রবল স্রোতে প্রতিনিয়ত নদীর পাড়ের মাটি সরে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার পাশাপাশি পাথরের ব্লক স্থাপন করা হলে ভাঙনের তীব্রতা অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।
চরতীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তুলাতলী চরপাড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে ইতোমধ্যে বহু বাড়িঘর নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় একটি মসজিদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আশপাশের আরও অনেক বসতবাড়ি হুমকির মুখে রয়েছে। একই এলাকার সেনেরচরেও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
নদীপাড়ের বাসিন্দা মো. ইনু মিয়া, আবদুল মোমেন ও মোক্তার আহমদ বলেন, প্রতিদিনই নদী ভাঙছে। চোখের সামনে মানুষের জমি-ঘর নদীতে চলে যাচ্ছে। দ্রুত জিও ব্যাগ ও পাথরের ব্লক দিয়ে ভাঙন বন্ধ করা না হলে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে। তারা বলেন, নদীর পাড়ের মানুষের পাশাপাশি স্কুল ও মসজিদও এখন হুমকির মুখে। তাই সরকারের কাছে দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
চরতী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হানিফ চৌধুরী বলেন, চরতীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি নদীর দুই তীরে স্থায়ীভাবে পাথরের ব্লক স্থাপন করে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও ফসলি জমি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চরতীবাসীকে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।
উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানান, চরতীতে নদীর পাড়ের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে আপাতত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিও ব্যাগ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, সাতকানিয়ার সাঙ্গু নদীর পাড়ের যেসব স্থানে ভাঙন হয়েছে, সেসব এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পুনর্বাসন ও প্রতিরক্ষা কাজের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। যেসব স্থান খুবই জরুরি, সেসব এলাকায় অস্থায়ী প্রতিরক্ষা হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বেশ কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাঙ্গু নদীর পাড়ে স্থায়ী স্লোপ প্রোটেকশনের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডে দাখিল করা হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, নদীতীরবর্তী চরতী ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বন্যায় সাঙ্গু নদীর পানির ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীর দুই পাড়ের যেসব অংশ ভেঙে গেছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের বিষয়ে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো অ্যাসেসমেন্ট করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এদিকে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। তাদের দাবি, শুধু অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানো নয়, সাঙ্গু নদীর তীর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে চরতী ইউনিয়নের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।