শিরোনাম
চট্টগ্রাম বন্দরের শিপিং চ্যানেলে বিশেষ অভিযান, অপসারণ ১২ হাজার মিটার অবৈধ জাল মাদকমুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে সম্মিলিত অঙ্গীকার, জেলা পুলিশের সুধী সমাবেশ ও র‍্যালি তুরস্কের ব্লু মসজিদের আদলে নির্মিত আলী শিকদার জামে মসজিদ, দক্ষিণ চট্টগ্রামে সবার নজর কাড়ছে কম মজুরির শ্রমের লোভে রোহিঙ্গা নিয়োগ, সাতকানিয়ায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ এক সেকেন্ডেই বিকল্প বিদ্যুৎ: শাহ আমানত বিমানবন্দরে লোডশেডিংয়ের দাবি নাকচ পুলিশের অভিযানে বিএসআরএমের চুরি যাওয়া ১২ টন ১০০ কেজি রড উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩ চবির নতুন প্রধান প্রকৌশলী ছৈয়দ জাহাঙ্গীর ফজল উন্নয়ন নিয়ে লিখলে সাধুবাদ, দুর্নীতি নিয়ে লিখলে হলুদ সাংবাদিক! ভিউ ও ডলারের নেশায় আমরা কোথায় যাচ্ছি? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি
রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১৭ পূর্বাহ্ন

কম মজুরির শ্রমের লোভে রোহিঙ্গা নিয়োগ, সাতকানিয়ায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ

মিজানুর রহমান রুবেল সাতকানিয়া প্রতিনিধি / ২৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দিন দিন বাড়ছে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি। ক্যাম্প থেকে বিভিন্নভাবে বের হয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান ও কাজে যুক্ত হওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ার আশায় কিছু ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ দিচ্ছেন। এতে স্থানীয় দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কর্মসংস্থানে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমিকরা কাজ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। একই সঙ্গে পরিচয় গোপন করে বসবাস, স্থানীয়দের সহায়তায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রোহিঙ্গারা প্রথম বড় আকারে বাংলাদেশে আসে ১৯৭৮ সালে। এরপর ১৯৯১-৯২ সালেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের আগস্টে। ওই সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আগের বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়ে কক্সবাজারে বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন অবস্থান করছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রায় ১২ লাখ মানুষের একটি দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী জনগোষ্ঠী বসবাস করছে।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় পরিবেশ ও স্থানীয় জনজীবনের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বসতি স্থাপনের জন্য বনভূমি পরিষ্কার, পাহাড় কাটা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অপরাধের জন্য পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দায়ী না করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পৃথকভাবে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের নীতিমতে রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত ক্যাম্পের বাইরে অবাধ চলাচলের সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন সময় ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের ঘটনা ঘটছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের দোহাজারী এলাকায় ৩৪৮ জন রোহিঙ্গাকে আটকের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক এসব রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের নির্ধারিত ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে বের হয়ে আসা বলে শনাক্ত করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালেও ভাসানচর থেকে বের হয়ে চট্টগ্রামে আসা ৩৫ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছিল।

সাতকানিয়াতেও বিভিন্ন সময়ে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আটক করে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। কেউ কেউ নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ, ইটভাটাসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় শ্রমিকদের অভিযোগ, কিছু মালিক কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ার আশায় রোহিঙ্গাদের কাজে নিচ্ছেন। এতে একই কাজের জন্য স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে রোহিঙ্গাদের কারণে সাতকানিয়ায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থান কত শতাংশ কমেছে—এমন কোনো সরকারি পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রশাসনিকভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ স্থানীয়দের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বৈধ বিয়ে বা বৈধ বসবাসের বিষয় এবং পরিচয় গোপন করে অবৈধভাবে অবস্থানের বিষয় এক নয়।

এদিকে ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ও পরিচয় জালিয়াতির অভিযোগও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ২০ আগস্ট ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা করার সময় দুই নারীকে আটক করা হয়। পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে গেলে তাদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে যাচাই-বাছাইয়ের পর তারা রোহিঙ্গা বলে শনাক্ত হয়েছে বলে আনসারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তাদের ঝালকাঠি সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন ধরে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পের বাইরে ছড়িয়ে পড়া কিছু রোহিঙ্গা বিভিন্ন অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি অপরাধে জড়িত কি না, তা তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তারা দ্রুত ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো এবং অবৈধভাবে আশ্রয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সাতকানিয়ায় দিন দিন রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, কয়েক মাস আগে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তারা আবারও ক্যাম্প থেকে বিভিন্নভাবে বের হয়ে সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আসছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যেহেতু ক্যাম্প থেকেই বের হয়ে আসছে, সেক্ষেত্রে কারও সহযোগিতা বা আশ্রয় ছাড়া তাদের পক্ষে ক্যাম্পের বাইরে এসে বসবাস করা কীভাবে সম্ভব—এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরও বলেন, সাতকানিয়ার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সামাজিকভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় জনগণ যদি নিজ নিজ এলাকায় রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বসবাসের সুযোগ না দেয় এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়, তাহলে রোহিঙ্গাদের অবাধে ছড়িয়ে পড়া অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে। সামাজিকভাবে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে সাতকানিয়াকে রোহিঙ্গামুক্ত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় শ্রমবাজার ও নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের বাইরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে কম মজুরির শ্রমিক পাওয়ার আশায় কেউ যাতে অবৈধভাবে ক্যাম্পের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের কাজে নিয়োগ না করেন, সে বিষয়েও সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের জনগণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ না বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করাই সংকটের স্থায়ী সমাধান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা এবং মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবস্থান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু কক্সবাজারের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘমেয়াদি সংকট। মানবিকতার জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দেশের স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুরক্ষিত রাখাও জরুরি। সাতকানিয়ায় ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ