শিরোনাম
পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের এডহক কমিটির সভাপতি হলেন আবু হেনা চৌধুরী বহুমুখী দায়িত্বে সাফল্য, মানবিকতায় প্রশংসিত—সাতকানিয়া ছাড়ছেন ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দক্ষিণ চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে পুলিশ সুপারের সঙ্গে নাগরিক পার্টির মতবিনিময় রিয়াযুল উলুম বালক-বালিকা মাদ্রাসায় কুরআন মাজিদের সবক প্রদান ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে চান্দগাঁও-মুরাদপুরে জোবাইরুল হাসান আরিফের শরবত-তাবারুক বিতরণ জেদ্দা থেকে চট্টগ্রামগামী বিমানের ফ্লাইট মাস্কাটে জরুরি অবতরণ, বাংলাদেশি যাত্রীর মৃত্যু সমাজ আছে, মানুষ আছে—শুধু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে মানবিকতা? চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি পুনর্বহাল, দীর্ঘ অপেক্ষার পর সাংগঠনিক স্বস্তি সৌদিতে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন, মানবপাচার চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল বোটসহ ১৬ জেলেকে উদ্ধার করেছে নৌবাহিনী
শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

বহুমুখী দায়িত্বে সাফল্য, মানবিকতায় প্রশংসিত—সাতকানিয়া ছাড়ছেন ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান

জাহাঙ্গীর আলম, মিজানুর রহমান রুবেল সাতকানিয়া / ৭৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের প্রায় এক বছরের কর্মকাল শেষ হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট সাতকানিয়ায় যোগদানের পর থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা, মোবাইল কোর্ট, আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব আদায়, বাজার ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, পরিবেশ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বদলি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর পরবর্তী পদায়ন ঢাকা বিভাগ/মন্ত্রণালয় ন্যস্ত করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সাতকানিয়ার নতুন ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রাজীব দাস পুরকায়স্থ।

কর্মকালীন সময়ে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি একাধিক অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের পাশাপাশি সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক দায়িত্ব, সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং চেয়ারম্যানবিহীন ইউনিয়ন পরিষদগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব দায়িত্বের মধ্যেও নাগরিক সেবা সচল রাখা, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও গ্রাম আদালতের কার্যক্রমসহ স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সময়ে উপজেলার ৩০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত ছিলেন তিনি।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের কর্মমূল্যায়ন ও সমন্বিত কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে ২০০টিরও বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে মাদক, অবৈধ ব্যবসা, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশবিধি অমান্য, অবৈধ স্থাপনা ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোবাইল কোর্ট ও প্রশাসনিক অভিযানের মাধ্যমে আদায়কৃত আনুমানিক ৭০ লাখের বেশি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। মাদক, কিশোর গ্যাং ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি অভিযান পরিচালনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাট-বাজার ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূমি ও নাগরিক সেবাসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসনে নিয়মিত উন্মুক্ত গণশুনানির ব্যবস্থাও করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কেরানীহাট ও কাঞ্চনা ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে অবৈধ দোকানপাট ও ফুটপাত উচ্ছেদ করে যানজট কমানো এবং পথচারীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। কিশোর গ্যাং, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন নির্বাচনী দায়িত্বও শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসন ভূমিকা রাখে।

ভোক্তা অধিকার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও প্রশাসনের তৎপরতা ছিল। কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায় রোধে ন্যায্যমূল্যে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির ব্যবস্থা, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরিতে ন্যায্যমূল্যের কৃষিপণ্য বাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। চাল, তেল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে জরিমানা আদায় করা হয়। অনুমোদনহীন চিকিৎসা কার্যক্রম, ভুয়া চিকিৎসক ও অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র কেরানীহাটের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে একাধিক মেগা পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং চারজন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে তাঁর কর্মকাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে বন্যা ও দুর্যোগকালীন মানবিক কার্যক্রম। ভয়াবহ বন্যার সময় পানিবন্দী মানুষের কাছে রাতের বেলায় নৌকায় করে খাদ্য, ওষুধ ও স্যালাইন পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ইমাম ও মুয়াজ্জিন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসহায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ত্রাণ কার্যক্রমে কোনো পরিবার যাতে বাদ না পড়ে, সে জন্য গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাদ পড়া পরিবারের তথ্য প্রশাসনকে জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। বন্যায় বই-খাতা হারানো শিক্ষার্থীদের নতুন বই, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়। বজ্রপাতে নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও আশ্রয়হীন এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য নতুন টেকসই ঘর নির্মাণের উদ্যোগও তাঁর কর্মকালীন মানবিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।

সামাজিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে হুইলচেয়ার, এতিমখানা, মাদ্রাসা ও সুবিধাবঞ্চিত শীতার্ত মানুষের মধ্যে কম্বল ও শীতবস্ত্র এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিন ও নগদ অনুদান বিতরণ করা হয়। সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে মন্দিরভিত্তিক শিশু শিক্ষা কার্যক্রমে খেলনা ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

শিক্ষা, ক্রীড়া ও অবকাঠামো উন্নয়নেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইপিএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত ও মাদক থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন খেলার মাঠ সংস্কার ও মাটি ভরাট করা হয়। উপজেলা পরিষদ চত্বরের ভবন, ড্রেনেজ, সংযোগ সড়ক ও বাগান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নদী পারাপারে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ছয়টি পাকা ঘাট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ ইটভাটা, পাহাড় কাটা এবং অনুমোদনহীন ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

এদিকে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের বদলির খবরে সাতকানিয়ার সচেতন মহলের মধ্যে তাঁর কর্মকাল নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাষ্য, একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর পরও তিনি সাধারণ মানুষের কথা শোনার জন্য গণশুনানি ও মাঠপর্যায়ে উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে বন্যার সময় পানিবন্দী মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার ঘর নির্মাণ, কেরানীহাটের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতায় উদ্যোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলার উন্নয়ন এবং মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান তাঁর কর্মকালকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

সাতকানিয়ার সচেতন মহলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের কর্মকাল দীর্ঘ না হলেও প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে চেষ্টা তিনি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে দুর্যোগের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য ঘর নির্মাণের উদ্যোগ মানবিকতার পরিচয় বহন করে। তাঁর বদলিতে সাতকানিয়াবাসী একজন কর্মঠ ও জনবান্ধব কর্মকর্তাকে বিদায় জানাচ্ছে। আমরা তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করি এবং সাতকানিয়ায় তাঁর নেওয়া জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

নিজের কর্মকাল সম্পর্কে খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “২৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে যোগদানের পর থেকে বহুমুখী দায়িত্ব পালনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, সততা ও মানবিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দুর্যোগের রাতে পানিবন্দী মানুষের দ্বারে দ্বারে সেবা পৌঁছে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। সাতকানিয়াবাসীর আন্তরিক ভালোবাসাই ছিল আমার কাজের মূল প্রেরণা।”

প্রশাসনিক দায়িত্বে একজন কর্মকর্তার কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে যেমন পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, সংকটকালে ভূমিকা এবং জনস্বার্থে নেওয়া উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের সাতকানিয়ায় কর্মকাল প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা, জনসেবা ও মানবিক উদ্যোগের সমন্বিত একটি অধ্যায় হিসেবে স্থানীয়দের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সচেতন মহলের অনেকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ