দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে চলমান স্থবিরতা দূর করে দ্রুত ফুটবল ও ক্রিকেট লীগ-টুর্নামেন্ট আয়োজনের দাবিতে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) সদস্য সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন পেশাদার ফুটবলার ও ক্রিকেটার, ক্রীড়া সংগঠক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।
৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামসংলগ্ন সিজেকেএস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় বিপুলসংখ্যক খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়া সাংবাদিক অংশ নেন। তাদের উপস্থিতিতে দীর্ঘদিন পর প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে স্টেডিয়ামপাড়া।

মতবিনিময় সভায় খেলোয়াড়রা বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে কার্যত স্থবিরতা বিরাজ করছে। নিয়মিত লীগ ও টুর্নামেন্ট আয়োজন না হওয়ায় পেশাদার খেলোয়াড়দের অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। জীবিকার তাগিদে কেউ রাইড শেয়ারিং করছেন, কেউ ফুটপাতে চা বিক্রি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
তারা বলেন, একজন পেশাদার খেলোয়াড় বছরের পর বছর মাঠের বাইরে থাকলে শুধু তার ক্যারিয়ারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পুরো ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। চট্টগ্রামের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়ানগরীতে দীর্ঘদিন লীগ-টুর্নামেন্ট না হওয়াকে তারা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ সময় খেলোয়াড়রা সিজেকেএস সদস্য সচিবের কাছে দ্রুত চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে ফুটবল ও ক্রিকেট লীগসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্ট চালুর জোর দাবি জানান।
ক্রীড়া সংগঠক ও গণমাধ্যমকর্মী তানভীর আহমেদ বলেন, মাঠে খেলা না থাকায় সাংবাদিকদের কলমও থেমে আছে। মাঠে খেলা থাকলেই ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। চট্টগ্রামের বরেণ্য ক্রীড়া সংগঠক মরহুম রাশেদ আজগর, শাহেদ আজগর ও প্রফেসর শায়েস্তা খানের মতো ব্যক্তিদের ঐতিহ্যের এই শহরে স্টেডিয়ামে নিয়মিত লীগ ও টুর্নামেন্ট না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে পূর্বের মতো বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল ও ক্রিকেট দলের খেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সিজেকেএস সদস্য সচিবের প্রতি আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য সচিব, ক্রীড়া সাংবাদিক ও সংগঠক সাইফুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সিজেকেএস সদস্য সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিন নিজেও একজন বরেণ্য ক্রীড়া সংগঠক। তাই খেলোয়াড়দের মর্মবেদনা তিনি সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, দ্রুত চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে লীগ ও টুর্নামেন্ট চালুর পাশাপাশি সিজেকেএসের নির্বাচন আয়োজন করে প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।
সভায় খেলোয়াড় ও সংগঠকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন সিজেকেএস সদস্য সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আপনারা আজ নানা দাবি নিয়ে এসেছেন। আপনাদের দাবির সঙ্গে আমি একাত্মতা প্রকাশ করছি।’
তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ইসরাফিল খসরুর সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিসিবির পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন সিজেকেএস সদস্য সচিব।
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আরও বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকদের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামের ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অঝোরে কাঁদলেন ক্রীড়া সংগঠক
মতবিনিময় সভার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয় চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে। সাবেক খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও আম্বিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল হাশেম রাজা বক্তব্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তার কান্নায় মুহূর্তেই সিজেকেএস মিলনায়তনে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে চট্টগ্রামে ফুটবল ও ক্রিকেট লীগ হচ্ছে না। একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে বিষয়টি তাকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়।
এ সময় সিজেকেএস সদস্য সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে উদ্দেশ করে আবুল হাশেম রাজা বলেন, ‘আপনি খেলা মাঠে নামান, স্পন্সর আনার দায়িত্ব আমার।’
তার এ বক্তব্য উপস্থিত খেলোয়াড়, সংগঠক ও সাংবাদিকদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করে।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক আব্দুস সাত্তার, সাবেক জাতীয় ফুটবলার মোহাম্মদ শাহেদ ও নাছির উদ্দিন, ক্রিকেটার ইকবাল বাহার, সিজেকেএস কাউন্সিলর সরওয়ার আলম চৌধুরী মনি এবং ক্রীড়া সংগঠক নূর জাহেদ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক কামরুল হুদা, আব্দুল সাত্তার, অনীক, রবিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রীড়া সংগঠক, খেলোয়াড় ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের ঐতিহ্য ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে হলে মাঠে নিয়মিত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত লীগ-টুর্নামেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি সিজেকেএসের সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করে খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরানোর দাবি জানান তারা।