চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নাংগলমোড়া গ্রামকে নিরাপদ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট কমিউনিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গ্রামটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ভিত্তিক স্মার্ট নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Softonnet Co., Ltd.-এর একটি প্রতিনিধি দল।
৫ অক্টোবর (সোমবার) প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে Softonnet-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) প্রফেসর দং হো চংনগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জংগ জিয়া হোন ও হাসানাল জায়েদ নাংগলমোড়া পরিদর্শন করেন। এ সময় উদ্যোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লায়ন আলহাজ্ব সালাউদ্দীন আলী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দল নাংগলমোড়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখে। তারা গ্রামের জনবসতি, সড়ক যোগাযোগ, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থান সম্পর্কে ধারণা নেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপনের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় AI Camera, AI CCTV ও Video Analytics প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত, স্মার্ট নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হতে পারে। এতে প্রচলিত সিসিটিভি ব্যবস্থার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভিডিও ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে AI Control Tower। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, অপরাধ কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া LLM-ভিত্তিক Emergency Response Management System উন্নয়নের কথাও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জরুরি পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ, পরিস্থিতির গুরুত্ব নির্ধারণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্যোক্তা লায়ন আলহাজ্ব সালাউদ্দীন আলী বলেন, “নাংগলমোড়ার মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। আজকের এই Feasibility Study সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই, প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়—বরং মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে কাজ করুক। নাংগলমোড়াকে শুধু একটি নিরাপদ গ্রাম হিসেবে নয়, ভবিষ্যতে একটি Smart, Safe and Connected Community হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
সালাউদ্দীন আলী আরও বলেন, “এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত, আইনগত কাঠামো, নাগরিক গোপনীয়তা এবং বাস্তব প্রয়োজনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর ওপর অযাচিত নজরদারি নয়। বরং আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, জরুরি সেবা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানোই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
Softonnet-এর প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকেও নাংগলমোড়ার ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিগত সমাধান নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও বাস্তবায়নযোগ্যতার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সমীক্ষার ফলাফল এবং স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পটির পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে নাংগলমোড়ায় AI-নির্ভর জননিরাপত্তা, স্মার্ট নজরদারি ও জরুরি ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবেও নাংগলমোড়া ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।