চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন এবং তাঁর তিন সহযোগীকে যশোর থেকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রামে আনা হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পৃথক গাড়িতে তাঁদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসে জেলা পুলিশের একাধিক দল। বর্তমানে ডেভিড ইমনসহ চারজন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
ডেভিড ইমনের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য তিনজন হলেন—আলিস তমাল, শাফায়াত ও শামীম। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁদের বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যশোর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ডেভিড ইমন ও তাঁর তিন সহযোগীকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জেলা পুলিশের একাধিক টিম পৃথক গাড়িতে তাঁদের নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা চট্টগ্রামে পৌঁছান। এরপর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চারজনকে জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জুনায়েত কাউছার বুধবার রাতে বলেন, ডেভিড ইমনসহ চারজন বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, সেটি এই মুহূর্তে জানানো সম্ভব নয়।
এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার রাতের অভিযানে ডেভিড ইমনকে আটক করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই ঘটনায় তাঁর তিন সহযোগীকেও আটক করে পরে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় একটি চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান শুরু করে যশোর জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। অভিযানে যশোর জেলা পুলিশের সদস্যদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সদস্যরাও অংশ নেন। অভিযান চলাকালে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের এক ব্যবসায়ীর কাছে ফোন করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ওঠার পর ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ে। অভিযোগের পর তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে বিভিন্ন স্থানে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় যশোরে অবস্থানের তথ্য পেয়ে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ডেভিড ইমন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে সাজ্জাদ বাহিনীর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা বা ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সমন্বয়, সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থসংক্রান্ত বিষয়েও তাঁর ভূমিকা থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।
পুলিশ বলছে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সাজ্জাদ বাহিনীর বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো, সদস্যদের অবস্থান, অর্থের উৎস এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত অন্য সদস্যদের অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, একই রাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের রংমারা এলাকায় পৃথক অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন সাজ্জাদ বাহিনীর আরেক শীর্ষ নেতা এবং কথিত কিলিং স্কোয়াডপ্রধান হিসেবে পরিচিত রায়হান আলম। তবে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
পুলিশের দাবি, অভিযানের সময় রায়হান আলম একটি ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান। তাঁকে ধরতে পুলিশ খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রায়হান আলমকে খুব কাছাকাছি গিয়েও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের নজরদারি রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং দ্রুতই তাঁকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন ও রায়হান আলমের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র আইনের একাধিক মামলার অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার অভিযোগ এখনো আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়াধীন এবং কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।
ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রামে আনার পর তাঁকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে, কখন আদালতে হাজির করা হবে কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হবে কি না—এ বিষয়ে বুধবার রাত পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি জেলা পুলিশ।
তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের কার্যক্রম এবং সাজ্জাদ বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতা সম্পর্কে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার হতে পারে।