বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ১২ জুন শুক্রবার গভীর রাতে নগরীর লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে অভিযোগের পর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)।
নাঈম হাসান জানান, ঢাকা থেকে তাঁর ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় রাত প্রায় সোয়া ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বহনকারী অটোরিকশার গতিরোধ করেন। তারা নিজেদের পরিচয় না দিয়েই তাঁকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন এবং চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেন।
নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কারণ জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর না দিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক অন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তাঁর গলা চেপে ধরা হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, সেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের এক ব্যক্তি তাঁকে লাঠি দিয়েও আঘাত করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাঈম বলেন, “আমি শুধু আমার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। তখনও আমার গলা চেপে ধরা ছিল। আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। প্রায় একশ থেকে দেড়শ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। অনেকেই আমার পরিচয় জানার পর প্রতিবাদ করেন। আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি। তারপরও তারা আমাকে ‘আসামি’ বলে সম্বোধন করে এবং কথা বলতে নিষেধ করে।”
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার আরও দাবি করেন, পরে তাঁকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুরুতে তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। তিনি বলেন, “থানায় আমাকে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলা হয়। পরে কারো ফোন আসার পর তাদের আচরণ বদলে যায় এবং আমাকে বসতে বলা হয়।” এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাঈম বলেন, “মানুষ আমাকে চিনত বলে আমি আজ বেঁচে গেছি। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে তার কী হতো, সেটি কেউ জানত না।”
এদিকে নাঈমের বাবা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মাহবুবুল আলম অভিযোগ করেন, ছেলেকে থানায় নেওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে গেলেও প্রথমে তাঁকে থানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “ডিউটি অফিসার আমাকে বাইরে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় প্রবেশের সুযোগ পাই। জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় পাওয়ার পরও আমার ছেলেকে ন্যাক্কারজনকভাবে মারধর করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। পরিচয় দেওয়ার পরও ওসির আচরণ ছিল অপমানজনক। পরে বিভিন্ন পর্যায় থেকে ফোন যাওয়ার পর পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে।”
ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান মাহবুবুল আলম।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় তিনি যেন ন্যায়বিচার পান এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়, সে বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, পুলিশের পক্ষ থেকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছি। তাই এ ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমরা মেনে নেব না। ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং কারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করেছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।”
ডিসি আমিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কেউ যদি তার কর্মকাণ্ডের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ সামনে আসার পর ক্রীড়াঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একজন পরিচিত ব্যক্তিই যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।