সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, কমিউনিটি নেতা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং প্রবাসী সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে বাংলাদেশ থেকে নতুন জনশক্তি রপ্তানি, প্রবাসী কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা, কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়া, নতুন কর্মী নিয়োগে বাধা এবং সামগ্রিক শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সায়েদুল আলম বাবুল। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আন্তরিক ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে চলমান ভিসা সংকটের সমাধান সম্ভব। এজন্য সরকার, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন দুবাইয়ের সাবেক ফাউন্ডার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি, নিউজ এশিয়া টিভি, ফিউচার হোম রিয়েল এস্টেট ও কেবিএন গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন পরিষদ (ইউএই)-এর সভাপতি আলহাজ মোহাম্মদ ইয়াকুব সৈনিক। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ সমিতি শারজাহর সাবেক সভাপতি হাজী সরাফত আলী, ইউএই বিএনপির সদস্য সিরাজুল ইসলাম নবাবসহ বিভিন্ন সামাজিক, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে তারা অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাই তাদের কর্মসংস্থান ও স্বার্থ রক্ষায় ভিসা-সংক্রান্ত বিদ্যমান জটিলতা দ্রুত নিরসনে বাংলাদেশ সরকার, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরও কার্যকর ও সমন্বিত আলোচনা জরুরি।
তারা আরও বলেন, চলমান ভিসা সংকটের কারণে ইউএইভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে পারছে না। এর ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শিল্প ও সেবা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা দেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
সভায় বক্তারা কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বিদেশগামী কর্মীদের আধুনিক ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভিসা-সংক্রান্ত অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রবাসীদের উদ্দেশে বক্তারা আইন-কানুন মেনে চলা, দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা, সততা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, প্রবাসীদের দায়িত্বশীল আচরণ দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
সভার শেষে নেতৃবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং ইতিবাচক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে চলমান ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান অচিরেই সম্ভব হবে। এর ফলে প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং নতুন কর্মসংস্থানের প্রত্যাশীদের জন্য আবারও সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।