স্মরণকালের ভয়াবহ ‘ছাব্বিশের বন্যা’য় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত মানুষের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে প্রস্তুতি সভা করেছে বাঁশখালী সচেতন নাগরিক ফোরাম। সভায় বন্যার কারণ অনুসন্ধান, বন্যা-পরবর্তী পানিপ্রবাহ জরিপ, কারিগরি টিম গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে গঠিত তহবিলের মাধ্যমে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
রোববার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানস্থ চিটাগং সিনিয়রস ক্লাবে এ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাঁশখালী সচেতন নাগরিক ফোরামের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও দেশের স্বনামধন্য শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. সৈয়দ মেজবাহুল হক সভায় সভাপতিত্ব করেন। সংগঠনের সদস্যসচিব ও বিশিষ্ট এনেসথেসিস্ট ডা. রশিদ আহমেদ সভা সঞ্চালনা করেন।
সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর, প্রবীণ শ্রমিক নেতা তপন দত্ত, সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিধান চন্দ্র ধর, সমাজচিন্তক মো. আবু জাহের চৌধুরী, প্রকৌশলী শিভেন্দু খাস্তগীর, অবসরপ্রাপ্ত বীমা কর্মকর্তা হাসান মোস্তফা, বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী, শীলকূপ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আকতার হোসেন, ফোরামের অর্থ সম্পাদক অজিত কুমার দাশ, বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক শহীদ উদ্দিন, কর আইনজীবী লায়ন শেখর দত্ত, বীমা কর্মকর্তা এএন হেলাল চৌধুরী, ব্যাংকার অঞ্জন কুমার দাশ, দৈনিক চট্টগ্রাম পোস্টের সম্পাদক মোহাম্মদ আইয়ুব, বাঁশখালী টাইমসের সম্পাদক আবু ওবাইদা আরাফাত এবং তরুণ সমাজকর্মী এনামুল হক।
সভায় বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও স্থানীয় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অনেক পরিবার দীর্ঘ সময় পানিবন্দি অবস্থায় মানবিক সংকটে পড়েন। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, বাঁশখালীর সাম্প্রতিক বন্যার নেপথ্যে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও থাকতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া, খাল ও জলাশয়ের প্রবাহ সংকুচিত হওয়া কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তারা বলেন, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাঁশখালীব্যাপী বন্যা-পরবর্তী পানিপ্রবাহ জরিপ পরিচালনা এবং জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সভায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ফোরামের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের দক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি টিম গঠনের পরিকল্পনার বিষয়টিও উঠে আসে। প্রস্তাবিত টিম বন্যাকবলিত এলাকার পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল-ছড়া ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে বলে আলোচনা হয়।
বক্তারা মনে করেন, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী, প্রবাসী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাঁশখালী সচেতন নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা হয়েছে।
ফোরামের নেতারা জানান, গঠিত তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় পরিবারগুলোর প্রয়োজন নিরূপণ করে দ্রুত মাঠপর্যায়ে পুনর্বাসন সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি মেরামত, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে সভায় আলোচনা করা হয়।
সভায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে ভারত থেকে দেশে ফেরায় বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করা হয়। পাশাপাশি ফোরামের সভায় প্রথমবার অংশগ্রহণ করায় সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিধান চন্দ্র ধরকেও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
সভা শেষে বক্তারা বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বাঁশখালীকে ভবিষ্যতের বন্যাঝুঁকি থেকে রক্ষায় পরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণে বাঁশখালী সচেতন নাগরিক ফোরাম কাজ করবে। খুব শিগগিরই পুনর্বাসন সহায়তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তারা।