ভোটার তালিকা হালনাগাদে অনিয়ম, মৃত সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্তি, একই সদস্যের নাম একাধিকবার রাখা এবং নির্বাচন তফসিল ও নোটিশ প্রকাশে বিধিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগে বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি (সীমিত), সিআরবি, চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপনা কমিটির ২০২৫ সালের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে।
সমিতির সদস্য ও পরিচালক প্রার্থী আবুল কালামের দায়ের করা অভিযোগের আপিল শুনানি শেষে গত ৮ জুলাই উপ-নিবন্ধক (বিচার) ও আপিল কর্মকর্তা জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা এ আদেশ দেন। তবে আদেশের অনুলিপি গত ২৮ জুলাই সমিতির কার্যালয়ে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন অভিযোগকারী আবুল কালাম।
একই সঙ্গে সমবায় সমিতি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা সমবায় অফিসার, চট্টগ্রামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশের নথি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২০২৫ সালে জেলা সমবায় অফিসারের কাছে বিরোধ মামলা দায়ের করেন পরিচালক প্রার্থী ও সমিতির সদস্য আবুল কালাম।
অভিযোগে বলা হয়, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গত বছরের ৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ওই তারিখে নির্বাচন না করে পরে ১৫ অক্টোবর নির্বাচন আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা যথাযথভাবে হালনাগাদ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
আবুল কালামের অভিযোগ অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় একই সদস্যের নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির নামও ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছিল। খসড়া ভোটার তালিকা যথাযথ নিয়মে প্রকাশ করা হয়নি এবং নির্বাচন তফসিল ও নোটিশ জারির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি।
এর আগে জেলা সমবায় অফিসার ও আরবিট্রেটর বিরোধ মামলা নং-১৪/২০২৫ খারিজ করে দেন। খারিজের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়টি চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী জজ, প্রথম আদালতে নির্বাচনী মামলা নং-০১/২০২৫ হিসেবে বিচারাধীন ছিল।
তবে পরবর্তীতে ওই নির্বাচনী মামলাটি চলতি বছরের ১ এপ্রিল বাদীপক্ষের তদ্বিরের অভাবে খারিজ হয়ে যায়। এরপর আপিল আবেদনের শুনানি শেষে বিভাগীয় সমবায় দপ্তর বিষয়টি পুনরায় আইনগতভাবে পর্যালোচনা করে।
আপিল শুনানির রায়ে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সমবায় সমিতি বিধিমালার ২৭ বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়, ৭ অক্টোবর নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একই কমিটি ১৫ অক্টোবর নির্বাচন পরিচালনা করেছে। এ কারণে পরবর্তী তারিখে ওই কমিটির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে আপিল কর্তৃপক্ষ মত দেন।
এ ছাড়া নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে সমবায় সমিতি বিধিমালার ১৪(৩) বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আপিল কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা প্রস্তুত, মৃত সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্তি, একই সদস্যের নাম একাধিকবার রাখা এবং খসড়া ভোটার তালিকা যথাযথভাবে প্রকাশ না করায় পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
নির্বাচনসংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। নথি অনুযায়ী, বিধিমালায় নির্ধারিত একাধিক পদ্ধতি অনুসরণ না করে শুধু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নির্বাচনসংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছিল। বিধিমালার বাধ্যতামূলক বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণও বিবাদীপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।
সব দিক পর্যালোচনা করে আপিল কর্মকর্তা রায়ে বলেন, গত বছরের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি (সীমিত), সিআরবি, চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন সমবায় সমিতি আইন, ২০০১—পরবর্তী সংশোধনীসহ—এবং সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪—পরবর্তী সংশোধনীসহ—অনুযায়ী যথাযথ ও আইনানুগভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি।
ফলে ওই নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়।
রায়ের দ্বিতীয় অংশে জেলা সমবায় অফিসার, চট্টগ্রামকে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী ও সমিতির সদস্য আবুল কালাম বলেন, ভোটার তালিকা প্রস্তুত থেকে শুরু করে নির্বাচন আয়োজন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আপিল কর্তৃপক্ষ নির্বাচন বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, রায়ের অনুলিপি সমিতির কার্যালয়ে পৌঁছেছে। এখন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
এই রায়ের ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নিষ্পত্তি হলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা সমবায় অফিসারের পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে সমিতির নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।