শিরোনাম
ন্যাশনাল গ্রিন মিশন বাস্তবায়নে রেলওয়ের বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান বাবা হারানো তিন বছরের শিশুর পাশে সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন শাহ আমানত বিমানবন্দরে ২৩৫ কার্টন সিগারেট জব্দ, রাজস্ব প্রায় ৬ লাখ টাকা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, অনিশ্চয়তায় ১ কোটি ৭০ লাখ নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা কেরানীহাটের নিত্যদিনের যানজটে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থী, রোগী, কর্মজীবী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা সাতকানিয়ায় পৃথক ঘটনায় জমি বিরোধে নিহত ১ জন সহ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের উষ্ণ অভ্যর্থনায় মুগ্ধ শিক্ষামন্ত্রী প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ: তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল প্রতিভা খোঁজার উদ্যোগ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে প্রশংসিত পদুয়ার চেয়ারম্যান প্রার্থী আরমানুল ইসলাম নবাব অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, অন্যায় করলে কঠোর ব্যবস্থা: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল
শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন

কেরানীহাটের নিত্যদিনের যানজটে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থী, রোগী, কর্মজীবী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা

মিজানুর রহমান রুবেল সাতকানিয়া প্রতিনিধি / ৪১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র কেরানীহাটে দীর্ঘদিনের যানজট এখন নিত্যদিনের জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কেরানীহাট স্টেশন ও আশপাশের মহাসড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কখনো কখনো কয়েকশ মিটার পথ পাড়ি দিতেও যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, রোগী, কর্মজীবী, ব্যবসায়ী এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের দূরপাল্লার যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কেরানীহাটে যানজট নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না নেওয়ায় দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময়, অফিস শুরু ও ছুটির সময় এবং বাজারকেন্দ্রিক ব্যস্ততার কারণে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এ সময় কেরানীহাট স্টেশন এলাকা থেকে আশপাশের বিভিন্ন সড়ক পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

কেরানীহাট চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, হাসপাতাল, ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বড় বাজার এবং অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে কেরানীহাটে আসা-যাওয়া করেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামমুখী হাজারো যানবাহন এ এলাকা দিয়ে চলাচল করে। ফলে স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ কেরানীহাটের যানজটকে আরও তীব্র করে তুলছে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ জানান, প্রতিদিনের যানজটে তারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। কর্মজীবীদের অনেককে সময়মতো অফিস বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে বাড়তি সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হতে হয়। এরপরও যানজটের কারণে অনেক সময় কর্মস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। এতে চাকরিজীবী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে।

শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিনের যানজটের বড় ভুক্তভোগী। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাগামী অনেক শিক্ষার্থী যানজটে আটকে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারে না। যানজটের কারণে কেউ কেউ ক্লাসে দেরিতে প্রবেশ করছে, আবার অনেককে পরীক্ষার দিন বাড়তি দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, সন্তানদের সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া এবং ছুটির পর নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে আনা এখন অনেক সময় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন অভিভাবক বলেন, “সকালে কেরানীহাট এলাকায় যানজট থাকলে শিশুদের স্কুলে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। কয়েক মিনিটের পথ কখনো কখনো আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে। যানজটের কারণে বাচ্চাদের ক্লাসে দেরি হয়, আবার দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসে থাকতে গিয়ে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।”

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন জরুরি রোগী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স। যানজটের কারণে অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সারিতে আটকে পড়ে। এতে গুরুতর রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিটের বিলম্বও রোগীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কেরানীহাট ও আশপাশের এলাকায় উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য অনেক রোগীকে চট্টগ্রাম নগরী বা অন্যত্র যেতে হয়। কিন্তু মহাসড়কের যানজটের কারণে তাদের যাত্রা দীর্ঘ ও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী এক যাত্রী বলেন, “কেরানীহাট স্টেশন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই যানজটে পড়তে হয়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকতে হয়। প্রচণ্ড গরমে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। কেরানীহাটের যানজটের কারণে পুরো যাত্রাপথে অতিরিক্ত সময় লাগে। দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।”

দূরপাল্লার যাত্রীদের অভিযোগ, কেরানীহাটের যানজটের প্রভাব শুধু স্থানীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এ কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় পর্যটক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও অন্যান্য যাত্রীরা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। অনেক যাত্রীর বাস, ট্রেন বা অন্য পরিবহনের নির্ধারিত সময়ও মিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যানজটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক ক্রেতা কেরানীহাট বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হন। যানবাহন নিয়ে বাজারে প্রবেশ ও বের হতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেকেই বিকল্প বাজারে চলে যান। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও বাড়তি সময় ও খরচ হচ্ছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “কেরানীহাট একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু যানজটের কারণে অনেক ক্রেতা বাজারে আসতে চান না। পণ্যবাহী গাড়িগুলোও সময়মতো আসতে পারে না। কখনো কখনো যানজটের কারণে পণ্য আনতে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হয়। এতে ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সিএনজি অটোরিকশা, মিনিবাস ও অন্যান্য যানবাহন যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। নির্দিষ্ট যাত্রী ওঠানামার স্থান ও কার্যকর পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক চালক মহাসড়কের ওপরই গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তুলছেন। এতে চলন্ত যানবাহনের গতি কমে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

এ ছাড়া মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকান, অবৈধ দখল ও ফুটপাতের ওপর বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার কারণেও পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পথচারী বাধ্য হয়ে মহাসড়কের মূল অংশ দিয়ে চলাচল করেন। এতে একদিকে যানবাহনের গতি কমে যায়, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

এ বিষয়ে কেরানীহাট ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, কেরানীহাটে যানজট সৃষ্টির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের জনবল সংকট, মহাসড়কের দুই পাশে ভাসমান দোকান, সিএনজি অটোরিকশা ও মিনিবাসের যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা, নির্দিষ্ট বাস টার্মিনাল এবং পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি বলেন, “বর্তমানে অনেক চালকের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা ও মিনিবাসগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই তারা আবার মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা শুরু করে। ফলে যানজট দ্রুত ফিরে আসে। সীমিত জনবল নিয়ে ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।”

ট্রাফিক ইনচার্জের মতে, কেরানীহাটের যানজট নিরসনে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত ট্রাফিক জনবল নিয়োগ, মিনিবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট টার্মিনাল ও পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, মহাসড়কের দুই পাশের অবৈধ দখল ও ভাসমান দোকান উচ্ছেদ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ এবং অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, কেরানীহাট চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শুধু ট্রাফিক পুলিশের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তাদের মতে, কেরানীহাটের যানজট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে অবৈধ পার্কিং বন্ধ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ, ভাসমান দোকান উচ্ছেদ এবং ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত বাস টার্মিনাল, সিএনজি স্ট্যান্ড, আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা, পথচারীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে।

কেরানীহাটের দীর্ঘদিনের যানজট শুধু মানুষের সময় নষ্ট করছে না; এর সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ব্যবসায়িক ক্ষতি ও মানসিক চাপ। দীর্ঘ সময় যানবাহনে আটকে থাকায় বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। একই সঙ্গে যানজটে ধীরগতিতে চলা ও এলোমেলোভাবে যানবাহন চলাচলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কেরানীহাটের যানজট সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দীর্ঘদিনের এ জনদুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যানবাহন চলাচল আরও স্বাভাবিক, নিরাপদ ও গতিশীল হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ