উপমহাদেশের কিংবদন্তি চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি), চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি), ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি (আইসিও) এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনকে চক্ষু চিকিৎসা সেবার উজ্জ্বল নক্ষত্র ও মহান কর্মবীর হিসেবে অভিহিত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপি।
তিনি বলেছেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন চক্ষু চিকিৎসা সেবায় একটি প্রতিষ্ঠান। মানুষের কল্যাণ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর আদর্শ ও কর্মকে ধারণ করে আগামী প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস আমবাগান রোডে নেভি কনভেনশন সেন্টারে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মৃতিচারণ উপলক্ষে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি) ও চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (সিইআইটিসি) উদ্যোগে এ শোকসভার আয়োজন করা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আজ যে মানুষটির স্মরণসভায় আমরা সবাই উপস্থিত হয়েছি, তিনি চক্ষু চিকিৎসা সেবার এক অবিস্মরণীয় নাম—অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন। তিনি ছিলেন একজন সেরা চিকিৎসক, সেরা ছাত্র এবং দেশের গর্ব। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।”
তিনি বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চট্টগ্রামে চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান থেকে দেশের লাখো মানুষ চোখের চিকিৎসা পেয়েছেন এবং অনেকেই ফিরে পেয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। চট্টগ্রামে একটি মানসম্মত চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলে তিনি এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করেছেন।
ড. এম এ মুহিত বলেন, “অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের মতো মানুষ খুব কমই জন্ম নেন। তিনি চলে গেলেও তাঁর কর্ম, আদর্শ ও স্বপ্ন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।”
তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে। তিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলেও সেখানে নিজের নামকে প্রাধান্য দেননি। ব্যক্তিগত পরিচিতি বা স্বার্থের কথা না ভেবে প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য বোর্ড অব ট্রাস্ট গঠন করে দিয়ে গেছেন। এটি তাঁর উদারতা, দূরদর্শিতা ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “রবিউল হোসেন চলে গেলেও তাঁর স্বপ্ন আজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর দুই সন্তান ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেন পিতার আদর্শ অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো সুন্দরভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছেন। এসব মানবিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান যাতে কোনো অপশক্তির কবলে না পড়ে, সে বিষয়ে সমাজের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।”
শোকসভায় গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এমপি বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন সমাজের জন্য অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবন, দর্শন ও কর্মের নানা দিক ‘প্লেজার অ্যান্ড পেইন’ গ্রন্থে উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কর্ম ও মানবিক দর্শন ধারণ করে আমরা যদি এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
সাঈদ আল নোমান বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চট্টগ্রামে যে চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন, সেখানে সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, দেশের আটটি জেলায় তাঁর উদ্যোগে চক্ষু চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। এমন একজন মহান মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে নাগরিক শোকসভার কার্যক্রম শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা মো. মেজবাহ উদ্দিন।
সিইআইটিসির ম্যানেজিং ট্রাস্টি ডা. কিউ. এম. অহিদুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শোকসভায় উপস্থাপনা করেন আইসিওর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মনিরুজ্জামান ওসমানী। স্বাগত বক্তব্য দেন সিইআইটিসি ট্রাস্টের ট্রেজারার মোহাম্মদ রেজওয়ান শাহিদী।
সভায় বক্তব্য দেন চক্ষু চিকিৎসা সমিতির উপদেষ্টা গোলাম মোস্তফা শামীম, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফুর রহমান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ছিদ্দীক স্যার, সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান শিরিন পারভীন হক, ইসলামিয়া হাসপাতাল ঢাকার মো. ফয়সাল সাহেদ, ময়মনসিংহ বিএনএসবি কে জামান হাসপাতালের প্রধান পরামর্শক ডা. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের দুই পুত্র—সিইআইটিসির মেডিকেল ডিরেক্টর ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব হোসেন এবং সিইআইটিসির ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য রিয়াজ হোসেন।
এ ছাড়া ফয়েজলেকের মো. মহিউদ্দিন, ডা. মেরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, ডা. সোমা রানী রায়, কেন্দ্রীয় ওএসবির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জিন্নুরাইন নিউটন, ডা. আবু নাসেরসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের জীবন ছিল মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। চিকিৎসাসেবাকে তিনি শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াকে জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর মানবিক দর্শন ও দীর্ঘদিনের কর্মসাধনার স্মারক হয়ে থাকবে।
তাঁরা আরও বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কর্ম ও আদর্শকে ধারণ করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে।
নাগরিক শোকসভা আয়োজন ও পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা করেন আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব এবং চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. রুকনুন চৌধুরী। সহযোগিতা করেন আয়োজক কমিটির সদস্য এবং চক্ষু হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. গোলাম ফারুক।