মিয়ানমারে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বিষয়ক জাপান সরকারের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, প্রত্যাবাসন-পরবর্তী পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন এবং জাপানি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষাৎকালে ইয়োহেই সাসাকাওয়া জানান, তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসনে কাজ করে আসছেন। মিয়ানমারে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বিষয়ে জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর কার্যক্রম ও ভূমিকার বিষয়েও তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ইয়োহেই সাসাকাওয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ যে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাপান সরকারের বিভিন্ন অনুদান ও মানবিক সহযোগিতার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ সফরের জন্য জাপানের বিশেষ দূতকে ধন্যবাদ জানান এবং দীর্ঘদিনের মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় জাপান সরকারের সহযোগিতা ও বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমনিতেই একটি জনবহুল দেশ। এর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে এ সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের বিশেষ দূতকে তাঁর অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর মিয়ানমারে তাদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরিতেও বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
এ সময় ইয়োহেই সাসাকাওয়া জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মিয়ানমার সরকার সংকট সমাধানে আন্তরিক বলে তিনি মনে করেন। তবে রাখাইন প্রদেশের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতিতে কিছুটা সময় লাগছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব ধরনের সহযোগিতা করতে আগ্রহী। নিজ দেশে ফিরে গেলে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
জাপানের বিশেষ দূত প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতার জন্য জাপানের বিশেষ দূতের প্রতি আহ্বান জানান। ইয়োহেই সাসাকাওয়া বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন বলে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ জাপানের বিনিয়োগ পেতে আগ্রহী এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ বৈঠক রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।