শিরোনাম
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, এবার প্রাণ গেল স্কুলছাত্রীর তামাকুমন্ডি লেইন মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী সমিতির নতুন কমিটি শত বছরের নথিতে রেলের দাবি, বিএস জরিপে বন্দর আগ্রাবাদ ডেবার ২৭.১৯৪ একর নিয়ে মুখোমুখি রেল-বন্দর রাঙামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি তরুণদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ শুরু বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে পাশে থাকার আশ্বাস জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের আট মাসে ৩ হাজার ৬২০ পিটিসিএ, দক্ষতা বাড়াতে তরুণ চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ রাউজানে গোল্ড মেডেল বৃত্তি পেল ৪ শিক্ষার্থী, পুরস্কৃত ৪০০ রাঙ্গামাটিতে অপরাধ পর্যালোচনা সভা, পুলিশ কর্মকর্তাদের নানা দিকনির্দেশনা ডেঙ্গু প্রতিরোধে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে রেলওয়ের বিশেষ মশক নিধন অভিযান পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩ উচ্চপর্যায়ের কমিটি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পিসিএনপির কৃতজ্ঞতা
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০১ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, এবার প্রাণ গেল স্কুলছাত্রীর

মিজানুর রহমান রুবেল সাতকানিয়া প্রতিনিধি / ৩৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া উপজেলার মিঠাদিঘী এলাকায় দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত ঈশা দাশ (১২) নামে এক স্কুলছাত্রী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বেপরোয়া গতির যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনাস্থলে স্পিড ব্রেকার স্থাপন এবং জড়িত বাসচালককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। পরে রাতে ওই স্থানে স্পিড ব্রেকার বসানো হয়।

নিহত ঈশা দাশ ছদাহা কেফায়েত উল্লাহ কবির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দাশপাড়ার বাসিন্দা সুনীল দাশের মেয়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে স্কুল ছুটির পর অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল ঈশা। এ সময় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় চট্টগ্রামমুখী দ্রুতগতির ‘স্টার লাইন’ পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সাতকানিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঈশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করলেও পথচারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। রাতে দুর্ঘটনাস্থলে স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা হয়।

দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত বাস ও বাসচালককে আটক করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে বিদ্যালয়ের সামনে স্পিড ব্রেকার বসানো হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ থেকে শুরু করে কক্সবাজারের বিভিন্ন অংশে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে মহাসড়ক পারাপার এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবকে এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

সম্প্রতি সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বাস, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের মার্চে সাতকানিয়ার পাটানীপুল এলাকায় বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। একই সময়ে সাতকানিয়ার মৌলভীর দোকান বাজার এলাকায় দ্রুতগতির একটি মিনিবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বাসের সহকারী নিহত ও কয়েকজন যাত্রী আহত হন। চন্দনাইশের দোহাজারী পৌর এলাকায় বাসচাপায় দুই স্কুলশিক্ষার্থী ও এক রিকশাচালক নিহত হওয়ার ঘটনাও মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকাও দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে সেখানে বাস, ট্রাক, পিকআপ, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনা কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ ওই অংশে সড়ক প্রশস্তকরণ ও চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের মতে, শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা।

কক্সবাজারের চকরিয়া অংশেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাস ও মোটরসাইকেল, দুই বাসের সংঘর্ষসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থেকেছে। ফলে একদিকে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন চট্টগ্রাম, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। পাশাপাশি কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রিক যান চলাচলের কারণে মহাসড়কটিতে দিন দিন যানবাহনের চাপও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে স্পিড ব্রেকার বসানোর পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সব স্কুল-কলেজ, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকার সামনে ঝুঁকি বিবেচনায় স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেপরোয়া গতির যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, চালকদের দক্ষতা ও লাইসেন্স যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

ঈশা দাশের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে—একজন শিক্ষার্থীর প্রাণ যাওয়ার পরই যদি দুর্ঘটনাস্থলে স্পিড ব্রেকার বসাতে হয়, তাহলে দুর্ঘটনার আগেই কেন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঈশার মৃত্যুর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ